নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : বন্দর আর বাণিজ্যের শহর চট্টগ্রাম এবার যেন তার নামের সার্থকতা খুঁজে পেল ব্যালট বাক্সেও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৪টিতেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি। তবে এই বিশাল জয়ের চেয়েও বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজয়ীদের পেশাগত পরিচয়Ñযাদের সিংহভাগই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ধানের শীষের প্রতীকে যে ১৪ জন বিজয়ী হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১২ জনই প্রতিষ্ঠিত ‘ব্যবসায়ী’। চাটগাঁর সওদাগরদের হাতেই যেন বন্দি হলো আগামীর রাজনীতির চাবিকাঠি। তবে এই ব্যবসায়িক জোয়ারের মাঝেও পেশাগত বৈচিত্র্যে কিছুটা ভিন্নতা এনেছেন সন্দ্বীপ ও হাটহাজারীর দুই কাণ্ডারি। চট্টগ্রাম-৩ আসনে বিজয়ী মোস্তফা কামাল পাশা নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন মাটির কাছাকাছি; তার পেশা মাছ চাষ ও সমাজসেবা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ব্যবসায়িক বলয়ের বাইরে থেকে পেশায় আইনজীবী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক বলয় থেকে উঠে আসা বিজয়ীরা হলেন-চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই): বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৩৮ ভোট।
জানা যায়, পোলট্রি, গরু, মৎস্য ও ট্রান্সপোর্ট খাতের ব্যবসায়ী নুরুল আমিন। হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নুরুল আমিনের প্রধান আয়ের উৎস ব্যবসা। এই খাতে তার বার্ষিক আয় হয় ১৯ লাখ টাকা। বাড়ি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া আদায় হয় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কৃষি খাতে বার্ষিক আয় ৫০ হাজার টাকা। তার কাছে নগদ টাকা রয়েছে ১০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। তার বার্ষিক আয় ২৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আয়কর হিসেবে তিনি ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫০ টাকা প্রদান করেছেন।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর (ধানের শীষ) ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৬২ হাজাত ১৬০ ভোট। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার আলমগীরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনএফজেড টেরি টেক্সটাইল। তিনি হালদা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপ: বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা (ধানের শীষ): ৭৩ হাজার ০৩৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আলাউদ্দীন সিকদার (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৬৬২ ভোট। মোস্তফা কামাল পাশা মাছ চাষ ও সমাজসেবায় জড়িত।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড): বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী (ধানের শীষ) ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার সিদ্দিক (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৮৯.২৬৮ ভোট।
জানা যায়, তার অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান হলো রাইজিং স্টিল লিমিটেড, যা জাহাজ ভাঙা এবং ইস্পাত তৈরির কাজে নিয়োজিত। এছাড়া কনফিডেন্স সল্ট ফ্যাক্টরি, সোনালী সিএনজি স্টেশন ইত্যাদি অন্যতম।
চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী: বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪ ভোট পেয়ে পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মো. নাসির উদ্দিন পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৫৮৯ ভোট।
মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ব্যবসায়িক বলয়ের বাইরে থেকে পেশায় আইনজীবী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন।
চট্টগ্রাম-৬ রাউজান: বিএনপি মনোনীত প্রার্থী গিয়াস কাদের ১ লাখ ১১ হাজার ২০১ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন ২৬ হাজার ৬৯৬ ভোট। তিনি প্রধানত শিপিং এবং টেক্সটাইল খাতের একজন সফল ব্যবসায়ী। তার পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিউসি গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার মালিকানাধীন ও পরিচালনাধীন প্রধান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ হলো: কিউসি শিপিং লিমিটেড, দ্য ঢাকা ডাইং, কিউসি কনটেইনার লাইন লিমিটেড, কিউসি পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, ইস্টার্ন মেরিটাইম লিমিটেড।
চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া: বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী ১ লাখ ১ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিম পেয়েছেন ৪১ হাজার ৭১৯ ভোট। তার পরিবার চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ‘কিউসি গ্রুপ’-এর মালিক। তার বাবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং চাচারা এই গ্রুপের উদ্যোক্তা ছিলেন-যার আওতায় শিপিং, লজিস্টিকস, পেট্রোলিয়াম এবং ট্রেডিংয়ের মতো বিভিন্ন খাতের ব্যবসা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৮ চান্দগাঁও-বোয়ালখালী: বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৩৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. প্রার্থী আবু নাছের পেয়েছেন ৫২ হাজার ৩৩ ভোট। তিনি বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) : বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ১ লাখ ৯ হাজার ৩৮৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৫০৭ ভোট। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার আয়ের অন্যতম উৎস হলো অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্থান এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত ভাড়া।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) : বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান ১ লাখ ২১ হাজার ৩৬৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শামসুজ্জামান হেলালি পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৪০৭ ভোট। তিনি চট্টগ্রামের অন্যতম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) : বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ লাখ ১৫ হাজার ৮১৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. শফিউল আলম পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৯১৬ ভোট। ব্যবসায়িক খাত হিসেবে তিনি হোটেল, বিমা, শিপিং, তৈরি পোশাক ও রপ্তানিমুখী প্যাকেজিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। হলফনামা অনুযায়ী, আলফা সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শেয়ার ও বন্ডে তার বিনিয়োগ ৪ কোটির বেশি। খাতুনগঞ্জে তার ১২টির বেশি দোকান রয়েছে। তিনি পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) : বিএনপি প্রার্থী মো. এনামুল হক ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোমবাতি মার্কার সৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ার পেয়েছেন ২৮ হাজার ৯৯৯ ভোট। তিনি পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং এক্সপো অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী): বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ১ লাখ ২৬ হাজার ১৯২ পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এসএম শাহজাহান মোমবাতি মার্কায় পেয়েছেন ৫১ হাজার ৪৫০ ভোট। ইস্পাত, জাহাজ ভাঙা, গার্মেন্টস, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও আর্থিক সেবা খাতে তার ব্যবসা রয়েছে। তিনি নিজাম’স শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান। ১৯৯৫-৯৬ সালে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ছিলেন।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) : বিএনপি প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দল সমর্থিত ও এলডিপি মনোনীত ছাতা প্রতীকের ওমর ফারুক পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬৭ ভোট। তিনি জেসিকা গ্রুপের চেয়ারম্যান। আবাসন ও পর্যটন খাতে তার বড় বিনিয়োগ রয়েছে। চট্টগ্রামে লালদীঘি এলাকার ‘মহল মার্কেট’ এবং খুলশী এলাকায় ‘জসিম হিল পার্ক’সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের মালিকানা তার রয়েছে। কক্সবাজার ও দুবাইয়ে হোটেল ব্যবসা এবং চট্টগ্রামে একাধিক বাণিজ্যিক সম্পদের মালিকানা রয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post