মো. কামরুল হাসান : এমন শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা দেশের আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হয়নি। ৬ জানুয়ারি শীতের কুয়াশা মোড়ানো ভোরে প্রারম্ভ হয়েছিল বহুল আরাধ্য, ত্যাগ, আন্দোলন, সংগ্রামের জকসুর। বিকেল ৪টা পর্যন্ত শতভাগ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সুশৃঙ্খলভাবে ভোট গ্রহণ শেষে আজ ৮ জানুয়ারি রাত ১২টার পরে গণনা কার্যক্রম শেষ হয়। ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১৫টি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ৫টিতে ছাত্রদল ও ১টিতে একজন স্বতন্ত্র জয় পেয়েছে।
ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসুর চেয়ে পুরোপুরি ব্যতিক্রম ছিল জকসু এমনটি বলা অত্যুক্তি হবে না। পুরো দেশের চোখ ছিল জকসুতে, এত টান টান উত্তেজনা, আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছাত্র সংসদ নির্বাচন আগে দেখেনি কেউ। কোনো রকম সহিংসতা ছাড়া, কোনো নেতিবাচক শিরোনাম ব্যতীত এত শ্বাসরুদ্ধকর ছাত্রসংসদ নির্বাচন খুবই বিরল জগন্নাথ তৈরি করল এই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৬৩ বছর ও বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২১ বছরের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি নতুন স্বতন্ত্র সত্তা পেয়েছে প্রথমবার অনুষ্ঠিত এই জকসুর মাধ্যমে। এ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের হূদয়ে প্রশান্তি ও গৌরবের ফল্গুধারার বয়ে গেল মোটাদাগে তিনটি উপলব্ধিতে- যা চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকার মতো।
প্রথমত, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ঢাবির পরেই জবি- এটা প্রতীয়মান হয়েছে আরও স্পষ্টভাবে। পুরো দেশ ও উৎসুক গণমানুষের দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল জকসুতে। জকসুর আমেজ পৌঁছে গেছে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে দাঁড়ান, জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্দোলন, সংগ্রামের পাওয়ার হাউস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের স্মারক পুরান ঢাকার জবিচত্বর থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরক্ষর, অতি সাধারণ চাষা-ভূষা-মুটে-মজুর মানুষের মাঝেও! এই অমোঘ দৃশ্যপট প্রমাণ করেছে, জকসু জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার প্রবল ক্ষমতা রাখে।
দ্বিতীয়ত, জবির রাজনীতিসচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিপক্ব বিবেচনাবোধ। ভোটাররা কেবল যোগ্যতার মানদণ্ডেই নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। যোগ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্যানেল মুখ্যত ছিল না। তাই কোনো প্যানেলেরই ভূমিধস পরাজয় হয়নি, পরাজয়েও বিজয় পেয়েছে প্রার্থীরা।
তৃতীয়ত, দেশের অন্যন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় জবিতে রাজনৈতিক সহাবস্থান প্রবল। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সৌন্দর্য ঐক্যের আবহ সবদল ও মতাদর্শের মাঝে পরস্ফূিট হয়েছে সবসময়ই। বড় দুই ছাত্রসংগঠনের অগণিত ইতিবাচক উদ্যোগ ও কর্মসূচি চোখে পড়েছে, বিশেষত ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়গুলোতে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ আর অন্যন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম সম্ভবত এসব মেরুকরণে। অন্য ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেলের মতো একচেটিয়া বিজয় হয়নি জবিতে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে, সকলের হূদস্পন্দের দ্রুত ছন্দের ওঠানামা হয়েছে এখানে! স্নায়ুচাপ সৃষ্টিকারী এমন তুমুল প্রতিযোগিতাই যে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আসল সৌন্দর্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতীত রাজনৈতিক সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ জগন্নাথ। জাতীয় স্বার্থে আন্দোলন সংগ্রামে এক ও অভিন্ন ব্যানারে সবার অপরিমেয় ভূমিকা থাকে। জুলাইয়ের অন্যতম দাবি ছিল ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বিলুপ্তি এবং ছাত্রসংসদ সচলকরণ। জকসু নিয়ে চতুর্মুখী অনেক ষড়যন্ত্র হলেও বৃহত্তর সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর চাপে অবশেষে জকসু সম্পন্ন হলো। প্রথমবারের এই জকসু জবির জন্য ঐতিহাসিক, জাতীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মাইলস্টোন।
ছাত্রসংসদ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মাঝে যোগসংযোগ তৈরি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত কণ্ঠ হয়ে কাজ করে, এটি শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থ, সম্মান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি যুগান্তকারী প্ল্যাটফর্ম। জকসুর কাছে শিক্ষার্থীদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দ্বিতীয় ক্যাম্পাস হতে হবে জকসুর প্রথম অগ্রাধিকার।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস পরিপূর্ণ হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মেরুদণ্ড শক্তিশালী হবে। জবির শিক্ষার্থীদের কোনো আবাসন সুযোগ নেই, বিশ্ববিদ্যালয় উপযোগী ক্যাম্পাসের অপ্রতুলতা, বাজেট বরাদ্দে জবিকে কোণঠাসা করে রাখার প্রবণতা, জাতীয় ইতিহাস থেকে মাইনাস করা, অবদান স্বীকার ও স্বীকৃতি দিতে অপারগতা প্রকাশের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করবে এই জকসু। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারলে, দ্বিতীয় ক্যাম্পাস হয়ে গেলে অনেক দূর এগিয়ে যাবে, নানাবিদ সিন্ডিকেটের ভিত দুর্বল হবে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সংঘাত, নেতিবাচক শিরোনামহীন একটি নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারা অনেক বড় সাফল্যের। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও, বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হয়নি। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রার্থী, পুলিং অফিসার, এজেন্ট, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও রোভার, বিএনসিসি, রেঞ্জার ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবীদের অভাবনীয় ডেডিকেশন ও পরিশ্রমে এই সাফল্য।
জকসু হওয়াটাই ছিল জবি শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে জকসু হয়েছে এটাই বড় বিজয়। পরাজিত প্রার্থীর সঙ্গে বিজয়ী প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান খুব কম- অতএব এ দৃষ্টিকোণ থেকেও কেউই হারেনি, বরং জগন্নাথের বিজয় হয়েছে।
পরিশেষে, জবিকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার দৃপ্ত শপথ নিতে হবে পরাজিত ও বিজয়ী সবাইকে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে সব মত পথের ঊর্ধ্বে উঠে। একটি সুষ্ঠু সুন্দর নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করণে এবং শিক্ষার্থী শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ অব্যাহত রাখা উচিত।
ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post