নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই ইস্যুতে আর কোনো সামরিক পথ অনুসরণ করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি জানান, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও আপাতত স্থগিত থাকবে।
এই ঘোষণার মাধ্যমে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অস্থিরতা সাময়িকভাবে থেমে গেলেও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কাটেনি। কারণ ট্রাম্পের নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে এবং হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
দুটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একদিকে তার কঠোর অবস্থান সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক কমানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর চাপ, বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কার কারণেই ট্রাম্প এই অবস্থান পরিবর্তন করেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিকে ২০২৬ সালের শুরুতেই বড় সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইন্সট্রুমেন্ট’ চালুর প্রস্তুতি নেয়।
এই পাল্টাপাল্টি শুল্ক নীতির ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে মুদ্রাস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ নতুন পোশাক ও বিলাসপণ্য কেনা কমিয়ে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ওয়ালমার্ট, এইচঅ্যান্ডএম, জারা ও গ্যাপের মতো বড় ব্র্যান্ডের বিক্রিতে। ফলে তারা বাংলাদেশ থেকে দেওয়া অনেক ক্রয় আদেশ বাতিল বা স্থগিত করে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে; যার প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই বাজারে একসঙ্গে চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের পোশাকশিল্প বড় চাপের মুখে পড়ে। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমানো হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে।
পোশাক খাতের পাশাপাশি শিল্প খাতের সরবরাহ
শৃঙ্খলেও বড় ধাক্কা লাগে। আধুনিক পোশাক শিল্পে ব্যবহƒত রং, রাসায়নিক দ্রব্য ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আমদানি করা হয়। শুল্ক যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক লজিস্টিক ব্যবস্থা ব্যাহত হলে কাঁচামালের সংকট দেখা দেয় এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে রাজি না হওয়ায় শিল্পকারখানার মুনাফা কমে যায়।
ডলার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ওঠানামার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়ে। জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশও কঠিন অবস্থানে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীন-রাশিয়ার জোটের মধ্যকার টানাপোড়েনে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই অস্থিরতার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়লে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সাময়িক স্বস্তি দিলেও তার নীতির অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য এটি একটি বড় সতর্ক সংকেত, যা অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী ও স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ট্রাম্প একদিকে কঠোর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, আবার অল্প সময়ের ব্যবধানে তা স্থগিত বা বাতিল করেন। এই অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার দিতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্রয় আদেশ কমানো, বিলম্ব করা কিংবা বাতিলের ঘটনাও ঘটছে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় ভোক্তারা খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে বড় ব্র্যান্ডের বিক্রিতে আর সেই চাপ তারা সরাসরি বাংলাদেশের কারখানাগুলোর ওপর দিচ্ছে কম দাম ও কম অর্ডারের মাধ্যমে।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এই ছয় মাসে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। গত ৪ জানুয়ারি ইপিবির হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম শেয়ার বিজকে বলেন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে আগামী মাসগুলোতে পোশাক রপ্তানি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে। এ বিষয়ে অবশ্যই পলিসি মেকারদের ভাবতে হবে।
ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি শুল্ক যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি নয়। বরং বৈশ্বিক বাজারে নতুন বাণিজ্য সমীকরণ তৈরি হলে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস হিসেবে আরও গুরুত্ব পেতে পারে। উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং অ-প্রথাগত বাজারে প্রবেশ জোরদার করা গেলে এ চ্যালেঞ্জকেই ভবিষ্যতের সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post