রাকিবুল ইসলাম : দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বৃহৎশক্তি হিসেবে ভারতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, প্রতিবেশী অপেক্ষাকৃত দুর্বল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দেশটি তখনই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, যখন সেখান থেকে এক ধরনের নীরব আনুগত্য বা কৌশলগত নিশ্চয়তা লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিংবা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে ভারত সেই শর্ত চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি যে মাত্রাতিরিক্তভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকে ছিল, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এমনকি সরকারের পতনের পরপরই দেশত্যাগ করে তাকে ভারতেই আশ্রয় নিতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ হাজির হয়।
প্রথমত, নতুন সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থাভিত্তিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন। দ্বিতীয়ত, হাসিনা আমলে সৃষ্ট বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি যে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করা। তৃতীয়ত, ভারতের পূর্ব সীমান্ত ঘিরে তার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির পুনর্মূল্যায়ন।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর কোনটি ভারত গ্রহণ করবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের সদিচ্ছার ওপর। তবে মজার বিষয় হলো—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জন্য আদৌ সুফল বয়ে আনছে কি না, সে প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠতে শুরু করেছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বর্তমানে ধর্মাশ্রয়ী ও ধর্মনিরপেক্ষ—এই দুই আদর্শে স্পষ্টভাবে বিভক্ত। ধর্মাশ্রয়ী শক্তি হিসেবে বিজেপি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলো কংগ্রেসের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারা বিজেপিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম হয়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি তৃতীয়বার সরকার গঠন করলেও এবার তাদের এনডিএ জোটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে—অর্থাৎ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে দলটি।
সরকার গঠনের পর থেকেই বিজেপির ভেতরে জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ নিয়ে আত্মসমালোচনা শুরু হয়। সেখানে উঠে আসে—‘হিন্দু তোষণ’কেন্দ্রিক পুরোনো রাজনীতিতে হয়তো কোথাও শৈথিল্য এসেছে। ২০১৯ সালের পর ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান বিজেপির জন্য কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ফলস্বরূপ দলটি আবার পুরোনো ফরম্যাটে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর ‘হিন্দু ভোট এক বাক্সে আনার’ আহ্বান তার স্পষ্ট উদাহরণ।
কিন্তু বড় সমস্যা হলো—নতুন করে ডানপন্থি হিন্দু ভোটকে কীভাবে ভয়ভিত্তিক রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করা যায়। বিজেপির দীর্ঘদিনের প্রচারণার মূল স্লোগান—‘হিন্দু খাত্রে মে হ্যায়’ (হিন্দুরা হুমকিতে) আজকের ভারতে ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে, যেখানে ভারতের শিক্ষার হার প্রায় ৮০ দশমিক ৯ শতাংশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষকে আগের চেয়ে বেশি সচেতন ও যুক্তিবাদী করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সংখ্যাগুরু হিন্দু কীভাবে হুমকিতে থাকে? বর্তমানে ভারতের প্রায় ১৫০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৯৬ কোটির বেশি হিন্দু এবং ২২ কোটির মতো মুসলমান। প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হলো—কোনো রাষ্ট্রে যদি কোনো সম্প্রদায় প্রকৃত অর্থে হুমকিতে থাকে, সেটি সবসময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী; সংখ্যাগুরু নয়। সংখ্যাগুরুর বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজনও পড়ে না। এই বাস্তবতা আজ কেবল সচেতন নাগরিক সমাজই নয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোও জোরালোভাবে সামনে আনছে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিজেপি আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উদাহরণ হাজির করছে। একসময় পাকিস্তান ছিল সেই ‘নিরাপত্তা ভয়’ তৈরির হাতিয়ার; বর্তমানে বাংলাদেশ তার সামপ্রতিক সংস্করণ। যদি বাংলাদেশে ডানপন্থি, চরমপন্থি ও ধর্মাশ্রয়ী কোনো শক্তির উত্থান ঘটে, তাহলে তা উভয় দেশের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনাগুলো সামনে এনে বিজেপি সহজেই ‘হিন্দু খাত্রে মে হ্যায়’ ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ডানপন্থি দলগুলোর ভারতবিরোধী উত্তপ্ত বক্তব্য সেই ন্যারেটিভকে আরও শক্তিশালী করবে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশের ডানপন্থি শক্তিগুলো ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ডানপন্থি শক্তি ও বাংলাদেশের ডানপন্থিদের মধ্যে কোনো অলিখিত সমঝোতা এরই মধ্যে হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ইসলামি মৌলবাদী শক্তির উত্থান দেখাতে পারলেই বিজেপির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকা সহজ হবে। অন্যথায় পরবর্তী নির্বাচনে তাদের পরাজয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখযোগ্য, সম্প্রতি ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াতের আমিরের সাক্ষাৎ নিয়ে দলটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এনসিপি ও জামায়াত যৌথভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও জনমনে নতুন করে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষণীয় নয়।
এসব বিবেচনায় বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং তার পূর্ববর্তী সময় শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post