নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কেনাকাটার চাপ বেড়েছে। গতকাল বুধবার রোজাকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লার দোকান ও কাঁচাবাজারে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে বাড়তি চাহিদার সুযোগে বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম এরই মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী। রোজায় বেশি ব্যবহƒত তিনটি সবজি-লেবু, শসা ও বেগুনের দাম এখন ‘সেঞ্চুরি’ ছুঁয়েছে। বাজারে লেবু বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা হালি। আর বড় আকারের লেবুর ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও হালি ১৬০ টাকাও চাইছেন বিক্রেতারা। শসা ও বেগুন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার এসব দেখা গেছে। হাতিরপুল বাজারে দেশি শসা কেজিতে ১৪০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। একই বাজারে খিরা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে। বেগুনের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমেনি; কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়। আকারভেদে লেবুর দামও বেশ চড়া। বড় আকারের একটি লেবু পাইকারিতে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে সেই লেবুর হালি দাঁড়াচ্ছে ১৬০ টাকায়।
খেঁজুরের বাজারেও চাহিদা বাড়তি। সাধারণ মানের খেজুর কেজিতে ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে ভালো মানের খেজুর দুই হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে ক্রেতাদের বেশি আগ্রহ ৫০০ থেকে ৭০০ এবং ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে থাকা খেজুরে।
নতুন ফল হিসেবে বাজারে এসেছে স্ট্রবেরি। কিন্তু দাম অনেক বেশি-কেজিতে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এ ফলের দাম থাকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। পাশাপাশি পেপে বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজিতে, বাঙ্গি প্রতিটি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পেয়ারা কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা। অন্যান্য ফলের দামও আগের তুলনায় কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি।
এদিকে রোজাকে কেন্দ্র করে বাজারে উঠতে শুরু করেছে তরমুজ। কারওয়ান বাজারে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৯০ টাকায়। বিক্রেতা হাতেম ফকির জানান, তরমুজ আরও আগেই বাজারে এলেও এখন সরবরাহ বাড়ছে। বরিশালের তরমুজ আসা শুরু হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম কিছুটা কমতে পারে।
কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে পাল্লাপ্রতি ২৭০ টাকায়, যা কেজিতে প্রায় ৫৪ টাকা। খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম ৬০ টাকা কেজি। রসুন পাইকারিতে ২০০ টাকা এবং আদা ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আলু পাইকারিতে পাল্লাপ্রতি ৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এছাড়া রোজাকে ঘিরে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। ছোলা কেজিতে ৮০ থেকে ১১০ টাকা, চিনি ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং মুড়ি ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৯৬ টাকায়।
মুগদা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক গৃহিণী বলেন, ‘রমজান এলেই সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এবারও একই অবস্থা। লেবু, শসা ও বেগুনের দাম এত বেশি যে কিনতে গেলেই কষ্ট হচ্ছে।’
অন্যদিকে রামপুরা বাজারে সদাই পাতি কিনতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, রোজার জন্য কিছু ফল কিনতে গিয়ে দাম শুনে অবাক হয়েছেন। তরমুজের কেজি ৯০ টাকা, অন্য ফলগুলোর দামও আগের তুলনায় অনেক বেশি। মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বাজার করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই ব্যবসায়ীরা পুরোনো কৌশল খুঁজছেন। নির্বাচনের কারণে যথাযথ বাজার তদারকি না থাকায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন সরকার দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর না হলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে বিক্রেতাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী কিছু পণ্যের সরবরাহে টান আছে। যার প্রভাব পড়েছে দামে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট ও মজুতদারির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
এদিকে রমজান উপলক্ষে গত মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি শুরু করেছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরÑএই পাঁচটি পণ্য বিক্রি করা হবে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেও টিসিবি এ পণ্যগুলো বিক্রি হচ্ছে।
প্রতি কেজি ছোলা ৬০ টাকা, খেজুর ১৬০ টাকা, চিনি ৮০ টাকা ও মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ভোজ্যতেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা দরে বিক্রি করা হবে। ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, এক কেজি চিনি, দুই কেজি ডাল, এক কেজি ছোলা ও বরাদ্দ সাপেক্ষে এক থেকে দুই কেজি খেজুর কিনতে পারবেন। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের কাছে প্রতিমাসে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রয়কৃত ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডালের পাশাপাশি রমজান উপলক্ষে তাদের কাছে ছোলা ও খেজুর বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিদিন রাজধানীতে ৫০টি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০টি ও সাতটি মেট্রোপলিটন এলাকায় ১৫টি করে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে এসব পণ্য বিক্রি করা হবে। অবশিষ্ট ৫৫ জেলায় পাঁচটি করে সর্বমোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করবে টিসিবি। চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত, ২০ দিন (শুক্রবার ও ছুটির দিন ছাড়া) এ বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে। ট্রাকসেলের মাধ্যমে সারা দেশে প্রায় ৩৫ লাখ উপকারভোগীর কাছে প্রায় ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হবে বলে টিসিবি জানিয়েছে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post