আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটছে না। তবে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে দেশীয় বড় কোম্পানি ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে দ্রুতই পুঁজিবাজারে আনা সম্ভব। সেক্ষেত্রে তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের নতুন শেয়ারের জন্য আরও ছয় মাস থেকে এক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রায় দুবছর ধরে দেশের শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির আগমন কার্যত বন্ধ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে টেকনো ড্রাগস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড তালিকাভুক্ত হওয়ার পর আর কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। ওই বছর মোট পাঁচটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এগুলো হলোÑসিকদার ইন্স্যুরেন্স, এনআরবি ব্যাংক, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, বেস্ট হোল্ডিং এবং টেকনো ড্রাগস। এর পর থেকে আইপিও বাজারে নীরবতা বিরাজ করছে।
আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বিধিমালা জারি করেছিল। একই সঙ্গে বহুজাতিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগের কথাও বলা হয়। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ধীরগতির কারণে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আইনি জটিলতার কারণে নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও দ্রুত নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, আইপিও আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ১২০ দিনের বেশি পুরোনো হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এছাড়া শুধু অর্ধবার্ষিক বা প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন দিয়ে আবেদন করার সুযোগও নেই।
আয়কর বিধি অনুসারে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাববছর শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান এপ্রিল পর্যন্ত আইপিও আবেদন করতে পারে। অন্যদিকে মার্চে হিসাববছর শেষ হওয়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য সময় থাকে জুলাই পর্যন্ত।
তবে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্তির বাইরে থাকা বেশিরভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বর্তমানে দুর্বল। তার মধ্যে আবার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারশূন্য ও হেয়ারকাট পদ্ধতির মতো কিছু জটিল ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় আইপিওতে আসতে কোম্পানিগুলো অনীহা দেখাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, আইপিওতে আসতে হলে সর্বশেষ অর্থবছরে মুনাফা থাকতে হবে এবং কোনো সঞ্চিত লোকসান থাকা যাবে নাÑএমন শর্ত পূরণ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান বাজারে আসতে পারছে না।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক নয়। অন্যদিকে সরকারি মালিকানাধীন কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা বোর্ড অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে।
বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় যেসব কোম্পানির হিসাববছর ৩০ জুন শেষ হবে, তাদের নিয়ে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর নাগাদ আইপিও আবেদন করতে পারবে। তবে আবেদন জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই, অনুমোদন এবং তালিকাভুক্তির পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে ভালো কোম্পানিগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তি হতে পারে।
নতুন বিধিমালায় স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, আবেদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ মতামত দেবে, এরপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। যদিও এতে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে পুরো প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদনমুখী অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে গেছে। ফলে আইপিওর উপযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনও তুলনামূলকভাবে কম। তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণ করতে না পারায় তারা বাজারে আসতে পারছে না। পাশাপাশি প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণও আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে দ্রুত আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন এবং লাভজনক বড় কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে দীর্ঘ মেয়াদে আইপিও খরা কাটানো কঠিন হবে।
মার্চেন্ট ব্যাংকাররা বলছেন, অতীতে আইপিও নিয়ে যেসব অনিয়ম ও কারসাজি হয়েছে, সেগুলোর কারণে বিএসইসির পক্ষ থেকে আগে যেসব আইপিও আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের বিদ্যমান বাস্তবতায় নতুন করে কেউ আইপিওতে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে কিছু দেশি বড় কোম্পানি ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ইস্যু ম্যানেজার কোম্পানিগুলো আইপিও আবেদনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে আবেদন করেছে। সেই বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল (আজ) একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকটিতে সব স্টেকহোল্ডাররা উপস্থিত থাকবেন। আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে হয়তো আইপিও আসতে পারে।
ডিএসই তথ্যানুসারে, আইপিওর মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে ৫২টি কোম্পানি ৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এক্ষেত্রে প্রতি বছর গড়ে আইপিওর মাধ্যমে ১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকার অর্থায়ন হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে চারটি কোম্পানি ৩২৭ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫টি কোম্পানি ১ হাজার ২৮৬ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি কোম্পানি ৪ হাজার ৮৪৮ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯টি কোম্পানি ৬৭৮ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯টি কোম্পানি ৮৪১ কোটি টাকা আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করেছে। তবে সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের পুঁজিবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে কোনো অর্থায়ন হয়নি। মূলত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) থেকেই পুঁজিবাজারে নতুন কোনো আইপিও আসছে না। ফলে দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে কোনো অর্থায়ন হচ্ছে না।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post