নাসরীন মুস্তাফা : হাসপাতালের এক কোণে ছোট্ট মেয়েটা জ্বরে কাঁপছে। মায়ের চোখে ঘুম নেই, হাতে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট। প্লাটিলেট দ্রুত নেমে যাচ্ছে। পাশের বেডে আরও দুজন রোগী। কারও শরীরে স্যালাইন চলছে। কেউ বমি সামলাচ্ছে। সারাদেশের হাসপাতালগুলোয় এমন দৃশ্যই এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে উদ্বেগজনক সংবাদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবেই আছে, এ পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের সংখ্যা ৫১ হাজারের বেশি। এ সময়ের ভেতর মারা গেছেন ২১৭ জন। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগী আর মৃত্যুবরণ করা রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ। যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে শিশু-কিশোর ও তরুণদের সংখ্যাই বেশি। সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী শহরাঞ্চলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর অনুপাত তুলনামূলক বেশি হলেও এ বছর গ্রাম-বিভাগেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্কবার্তা আছে।
ডেঙ্গু জ্বর ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে হয়, যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে মারাত্মক রোগের তালিকায় রেখেছে। বর্ষা শুরু হলেই ডেঙ্গু জ্বরের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এ সময়ে ডেঙ্গুর মশা খুব বেশি সক্রিয় হয় এবং এর কামড় থেকে ডেঙ্গু জ্বর হয়। প্রচণ্ড জ্বর, অনেক বেশি দুর্বলতা, শরীর ব্যথা, গাঁটে ব্যথা হয়ে অবস্থা নাজেহাল করে তোলে। সাধারণ জ্বরের তুলনায় ডেঙ্গু অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ এর মৃত্যুহার প্রায় ১.৩ শতাংশ। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে শরীরে লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়। ডেঙ্গু একসময় ‘বর্ষার রোগ’ বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি ঋতুর সীমানা ছাড়িয়ে এক ভয়াল জনস্বাস্থ্য সংকট হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সংবাদে যোগ হচ্ছে নতুন নাম, নতুন মৃত্যু। এমন এক বছর এটি, যখন প্রায় প্রতিটি পরিবারই কাউকে না কাউকে ডেঙ্গুর গ্রাসে হারিয়েছে বা হারানোর ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে পোস্ট দেখা যায়নি তেমন একটা। মানুষের মাঝে উদ্বেগ নেই। চেনা মানুষের বিপদের সংবাদে কিংবা যখন নিজের ঘরে হানা দিচ্ছে মৃত্যুদূত, তখন অনুভবের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে উদ্বেগ। অথচ এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ কিন্তু গত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। কেন এমন হলো? ডেঙ্গুর এই বাড়াবাড়ি কারণ আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।
অনেক সময় ধরে বৃষ্টি না থাকা বা হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হওয়া মশা বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বৃষ্টির পানি জমে থাকা স্থানগুলো মশার উপযুক্ত প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। প্রকৃতি, শহর পরিকল্পনা, জলবায়ু এবং আমাদের অবহেলা মিলেমিশে তৈরি করেছে ডেঙ্গুবান্ধব বাস্তবতা। আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়েই কথা বলা উচিত প্রথমে। কিছুদিন আগে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল এরকম— Bangladesh Sees Worst Single-day Surge in Dengue Cases and Deaths This Year. বৃষ্টি মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। বর্ষার পরিপ্রেক্ষিতে পানির মুক্ত চলাচল কমে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ গড়ে উঠছে জলাবদ্ধতা যেখানে মশার বংশবৃদ্ধি হচ্ছে অনেক বেশি।
তাপমাত্রা বাড়লে ডেঙ্গু ভাইরাস মশার দেহে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মশার উড়ানের সময়ও বেড়ে যায়, যা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়িয়ে তোলে। আমেরিকার ন্যাশনাল লাইব্রেবির অব মেডিসিনের অনলাইন জার্নালে প্রকাশিত ডেঙ্গু ফিভার ইন বাংলাদেশ: রাইজিং ট্রেন্ডস, কনট্রিবিউটিং ফ্যাক্টরস, অ্যান্ড পাবলিক হেলথ ইমপ্লিকেশনস শীর্ষক গবেষণাপত্রে বাংলাদেশে এ বছরের ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য দায়ী করা হয়েছে তাপমাত্রার বৃদ্ধি, আর্দ্রতা বেশি হওয়ার মতো আবহাওয়াকে যা মশাদের ডিম পাড়ার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়, অর্থাৎ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়ে। এছাড়া শহরায়ণ ও জনসংখ্যার ঘনত্ব পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে, শহরগুলোর অবকাঠামো সব জায়গায় প্রস্তুত নয়। শহরকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে প্রস্তুত করার মতো দক্ষ পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার মতো ব্যর্থতা আমাদেরই। শহরের বাসিন্দারা ব্যবহূত প্লাস্টিকসামগ্রীর মধ্যে জমে থাকা পানি ফেলার ব্যাপারে সচেতন নয়, ড্রেনের ভেতর পলিথিন ফেলছে অবলীলায়, মশারি ব্যবহারে আলসেমি। এ বছর গ্রাম এলাকাগুলোও বাদ পড়েনি ডেঙ্গুর থাবা থেকে। প্রধান শহরগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামে গ্রামে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নির্ণয় ও দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ এখনও শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক কম।
এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু যেমন বেশি, ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বেশি। ডেঙ্গু রোগের নকশা নাকি বদলে যাচ্ছে! এরকম ভয় ধরানো সংবাদ পড়েছিলাম দুই বছর আগে, বাংলাদেশ ব্যাটলস রেকর্ডস ডেঙ্গু ডেথস অ্যাজ ডিজিস প্যাটার্ন চেঞ্জেস শীর্ষক আলজাজিরার এক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে। মৃত্যুর সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে, এর পেছনে দায়ী এই নকশাও। কেউ একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে সব ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে রক্ষাকবচ পেয়ে যান, ব্যাপারটা তেমন নয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সেরোটাইপের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলেও, অন্য সেরোটাইপ দ্বারা আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। যারা একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের দ্বিতীয়বার অন্য সেরোটাইপ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই দ্বিতীয় সংক্রমণটি অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। কারণ এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় একটি”যুদ্ধংদেহী” প্রতিক্রিয়া ঘটে, যা রক্তনালিকে ছিদ্রযুক্ত করে এবং আরও নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। সঙ্গত কারণেই যারা একবার আক্রান্ত হয়েছেন, তারা দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে রোগের জটিলতা বেশি হয়। বর্তমানে নতুন সেরোটাইপ দেখা যাচ্ছে। যার কারণে ডেঙ্গু রোগীদের অবস্থা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। এর সঙ্গে আছে আমাদের জাতীয় চরিত্রগত সমস্যা—চিকিৎসায় সময়ক্ষেপণ। অনেক রোগী জ্বর-লক্ষণ দেখার পর বাড়তি দেরি করেছেন হাসপাতাল যেতে বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার নানা দুরবস্থার বাস্তবতাকেও এড়ানোর উপায় নেই। হাসপাতালে রোগীরা প্রাথমিক সেবা বা ফ্লুইড থেরাপি সময়মতো পান না। আছে চিকিৎসক সংকট, নার্স সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও মশার ওষুধ ছিটানোর বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করার অভিযোগকেও এড়ানোর উপায় নেই। ডেঙ্গু এখন শুধু একটি রোগ নয়—এটি বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও নাগরিক সচেতনতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত, টেকসই ও তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ। প্রথমত, নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত করতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় মাসিকভাবে লার্ভা জরিপ চালানো বাধ্যতামূলক করতে হবে; যাতে আগেভাগে সংক্রমণ প্রবণ অঞ্চল শনাক্ত হয়। ফগিং বা স্প্রে নয়, লার্ভা ধ্বংসের স্থায়ী ব্যবস্থা—যেমন ড্রেন পরিষ্কার, জমে থাকা পানি নিষ্কাশন ও নির্মাণস্থলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে বাস্তব পর্যায়ে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা যেতে পারে, যারা সপ্তাহে একদিন ‘পানি ফেলা অভিযান’ পরিচালনা করবে। মিডিয়া প্রচারণায় কেবল ভয় দেখানো নয়, মানুষকে নিজের ঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি ও ডেটা-শেয়ারিং ব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি। ডেঙ্গু প্রতিরোধকে সারাবছরের জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে।
আপাতত আমরা প্রত্যেকের জায়গা থেকে ব্যক্তিগত সচেতনতার মাত্রা বাড়ানোর কাজ করি। জ্বর হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা ও প্লেটিলেট মনিটরিং করতে হবে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে, বাড়িতে অনির্দিষ্ট ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কী লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, জানা থাকতে হবে সবার। হঠাৎ উচ্চ মাত্রার জ্বর, সঙ্গে তীব্র পেট ব্যথা, বারবার বমি, মুখ-নাক বা দাঁতের পাটি দিয়ে রক্ত পড়লে, বুকের ভেতর ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করলে, হঠাৎ চেতনা হারালে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো তরল গ্রহণ এবং পর্যবেক্ষণ রোগীর জীবন রক্ষা করে। আসুন, অসুস্থ হওয়ার আগে অসুস্থ হওয়া ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করি। বাসার আশপাশের ছোট-বড় সব পাত্র ঢেকে রাখি বা উল্টে রাখুন। স্থানীয়ভাবে নিজেদের এলাকা পরিষ্কার রাখতে পরিচ্ছন্নতা কাজে অংশগ্রহণ করুন, সহযোগিতা করুন। ডেঙ্গুর বাড়াবাড়ি রুখতেই হবে আমাদের!
পিআইডি নিবন্ধ
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post