নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: চৌধুরী নাফিজ সরাফাত-না ব্যবসায়ী, না বিনিয়োগকারী। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রিয়ভাজন ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), র্যাব, অর্থ মন্ত্রণালয় ও ব্যবসা থেকে সব নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছিল। অনেক ব্যবসায়ীর মতে, তিনি মূলত প্রফেশনাল দালাল। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইলে দুদক দিয়ে নাফিজ সরাফাত হেনস্তা করতেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিনা পুঁজির ব্যবসা করতেন তিনি। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তার মূল হাতিয়ার ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক।
সূত্রসতে, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন এই নাফিজ সরাফাত। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর স্বীকারোক্তিতে জানা গেছে, কারাগারে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র্যাব) নির্যাতনে বাণিজ্যিক খামার ও কুমিরের উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদের মৃত্যু হয়েছিল।
আরও জানা যায়, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে করা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাটি দুদককে দিয়ে নাফিজ সরাফাত করিয়েছিলেন।
একসময় দেশের আর্থিক খাতে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ছিলেন অদৃশ্য ক্ষমতার কেন্দ্রে, ব্যাংক, পুঁজিবাজার, মিডিয়া, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও আবাসনসহ প্রায় সব খাতেই ছড়িয়ে ছিল তার বিনিয়োগ ও প্রভাবের চিহ্ন। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সখ্যের কারণে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলে তিনি থাকতেন আলোচনার কেন্দ্রে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও বরাবরই মিডিয়ার আড়ালেই ছিলেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে তার নানা আর্থিক অনিয়মের চিত্র।
একসময় পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। গড়ে তোলেন হাজার হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য। নামে-বেনামে পদ্মা ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দিয়ে ব্যাংকটিকে নাফিজ সরাফত প্রায় দেউয়িলাত্বের দিকে নিয়ে যান। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে বিপুল শেয়ার বিক্রি করেও টাকা বিদেশে পাচার করেন নাফিজ সরাফাত। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বর্তমানে কানাডায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন তিনি।
ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এখন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও প্রতারণার অভিযোগের পাহাড় জমেছে। ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া তদন্তে ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছেÑকোথায় ও কীভাবে গড়ে উঠেছে এই রহস্যময় সম্পদের সাম্রাজ্য।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ছায়ায় সাধারণ ব্যাংকার থেকে প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৯ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে সাধারণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু নাফিজ সরাফাতের। চাকরিরত অবস্থায় আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালক হওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তিনি ব্যাংক ছাড়েন। ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে ‘রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’ নামের একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার মধ্যদিয়েই তার ব্যবসায়িক উত্থান শুরু হয়।
পরবর্তী দেড় দশকে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক ব্যবসা থেকে বেরিয়ে তিনি হোটেল, বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার, আবাসন, মিডিয়া, অ্যাগ্রো, আইটি ও শিক্ষাসহ বহুমুখী খাতে বিনিয়োগ করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মাসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টে (সিআইডি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
দুদকের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত ৫২টি প্রতিষ্ঠানে তার ও পরিবারের বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। দেশ-বিদেশে স্থাবর সম্পদের খোঁজও পাওয়া গেছে।
গত আগস্টে নাফিজ ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। একসময় যিনি সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব খাটাতেন বলে অভিযোগ ছিল, সেই নাফিজই পরে গা ঢাকা দিয়ে বিদেশে চলে যান বলে বিভিন্ন সূত্রের খবর। ইতোমধ্যে আদালতের আদেশে নাফিজ, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা সাহিদ ও ছেলে চৌধুরী রাহিব সাফওয়ান সরাফাতের ৭৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
গত বছরের ৭ জানুয়ারি আদালত নাফিজ ও তার পরিবারের নামে থাকা বাড়ি, জমি ও ১৮টি ফ্ল্যাট ক্রোকের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে গুলশানে ২০ তলা ভবন, ক্যান্টনমেন্ট, নিকুঞ্জ, বসুন্ধরা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট।
স্ত্রীর নামে বসুন্ধরা, গুলশান লিংক রোড, পান্থপথ ও মিরপুর ডিওএইচএসে একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে। ছেলের নামে বনানী ও বারিধারায় থাকা সাতটি ফ্ল্যাটও জব্দের তালিকায় রয়েছে। এছাড়া দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট ও একটি ভিলাও আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়েছে।
বিতর্কিত রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অধীনে বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ১০টি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে, যার মোট আকার প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এসব ফান্ডের বিনিয়োগের বড় অংশ তালিকাভুক্ত নয়Ñএমন কোম্পানিতে, যেখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ফান্ড অবসায়ন না করে মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে নাফিজের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালে বিএসইসি রেইসের লেনদেন স্থগিত করলেও পরে আদালতের আদেশে তা প্রত্যাহার করা হয়।
রেইসের ফান্ড থেকে ফারমার্স ব্যাংকে (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি ব্যাংকটির পরিচালক ও পরে চেয়ারম্যান হন। সরকার ব্যাংকটিকে বাঁচাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিলেও ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ তার সময়ে আরও বেড়ে যায়।
২০২১ সালে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোরের আঁকা একটি কার্টুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলে। চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে চিত্রায়িত করা ওই কার্টুনে নাভির জায়গায় দেখা যায়, ব্যাংকের প্রতীক সিন্দুকের হাতল। তাতে ক্যাপশন ছিলÑ‘আমি চৌ নাফিজ সারাফাত / জানি ব্যাংক খাওয়ার ধারাপাত!’
সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় বলা হয়, কিশোরের আঁকা ওই কার্টুনের ওপরের ক্যাপশনটি লিখেছিলেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মুশতাক আহমেদ।
ওই বছর মে মাসে ‘সরকারবিরোধী প্রচার ও গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে মুশতাক, কিশোরসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বারবার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে মৃত্যু হয় ৫৩ বছর বয়সি মুশতাকের। আর কিশোর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। অনেকের মতে মুশতাক আহমেদ হত্যার পেছনে এই নাফিজ সরাফাতের হাত ছিল।
নাফিজ সরাফাতের সঙ্গে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের ঘনিষ্ঠতার কথা খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে বহুল আলোচিত। শেখ হাসিনার বিদেশ সফরেও তাকে একাধিকবার সঙ্গী হতে দেখা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। আরও সম্পদের সন্ধান মিলতে পারে।’
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post