ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : প্রাচ্যের ডান্ডিÑএকসময়কার জমজমাট শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর নারায়ণগঞ্জ। পাট, বস্ত্র, নদীবন্দর আর উদ্যোক্তাদের প্রাণচাঞ্চল্যে গড়ে ওঠা এই নগরী আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাবে এই শিল্পনগরী এখন ধীরগতির অর্থনীতির বাস্তবতায় আটকে আছে। নতুন সরকারের নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী মহলে আবারও এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ তৈরি হয়েছে এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার।
চলতি বছরের ঈদুল ফিতর ঘিরে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্ট খাতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। বড় ও রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মাঝারি ও ছোট কারখানাগুলোর বড় অংশই কেবল বেতন দিতে পেরেছে, বোনাস দিতে পারেনি।
শ্রমিক অসন্তোষ বড় আকার ধারণ না করায় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন উভয়ই কিছুটা স্বস্তিতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন প্রশাসনের তৎপরতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং শ্রমিক ব্যবস্থাপনা সংলাপের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে ঈদ-পরবর্তী বাজারে চিত্র ভিন্ন। পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বিক্রি কমেছে। নগরীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোয় আগের মতো ক্রেতার ভিড় নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের হাতে নগদ অর্থ কমে যাওয়ায় কেনাকাটা সীমিত হয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাট খাত বর্তমানে সবচেয়ে বড় চাপের মুখে। সরকারের কাঁচা পাট রপ্তানি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কারণে গত চার মাস ধরে এ খাতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। পাট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গুদামে পাটের মজুত থাকলেও নগদ অর্থের প্রবাহ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী জানান, পাট কিনে গুদামে রাখতে হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি করতে পারছি না। ব্যাংকের সুদ দিতে হচ্ছে, কিন্তু আয় নেই। এতে করে আমরা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
নারায়ণগঞ্জের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে ব্যবসায়ীরা একটি ‘দুষ্টচক্র’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ব্যবসা কমে গেলে শ্রমিক ছাঁটাই হয় বা আয় কমে যায়। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে আবার বাজারে বিক্রি কমেÑএভাবে পুরো অর্থনীতি একটি সংকুচিত বৃত্তে আটকে পড়ে। নিতাইগঞ্জ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শংকর সাহা বলেন, গত কয়েক বছরে আমাদের ব্যবসা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। তবে আমরা আশা ছাড়িনি। একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এলে আস্থা ফিরবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নিট গার্মেন্ট শিল্প। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব এবং ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় এ খাতেও মন্দা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল জানান, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ২৬০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জেই রয়েছে ৪৫টি। এর ফলে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকেই গ্রামে ফিরে গেছেন, কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করেছেন। নগরীর দুই নম্বর রেলগেট এলাকার শ্রমিক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, আগে দিনে এক-দুই হাজার টাকা আয় করতাম, এখন ৩০০ টাকাও হয় না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।
খাদ্যপণ্যের বাজারও এই মন্দা থেকে মুক্ত নয়। মণ্ডলপাড়ার শুভ রাইস এজেন্সির মালিক ও জেলা চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম লিটন জানান, দুই বছর আগের তুলনায় ব্যবসা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। তার মতে, গার্মেন্ট খাত সংকুচিত হওয়ায় নগরীতে জনসংখ্যা কমেছে। ফলে চালের চাহিদাও কমে গেছে।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংকটও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সাইনবোর্ড থেকে জিমখানা ব্রিজ পর্যন্ত এলাকায় ট্রাকের ত্রিপল কেটে চাল চুরি করার ঘটনা বেড়েছে। এতে পরিবহনকারীরা নারায়ণগঞ্জে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী। যেসব ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, তার সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশে, যা আগে সিঙ্গেল ডিজিটে ছিল। একইসঙ্গে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের খরচ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যাহত করছে। পরিবহন খরচ, টোল এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। নিতাইগঞ্জ এলাকায় বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
নির্মাণ খাতের ধীরগতির কারণে রডশিল্পেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুর রশিদ জুয়েল জানান, সরকারি প্রকল্প কমে যাওয়া এবং বেসরকারি নির্মাণকাজ স্থবির থাকায় রড বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। এ খাতে ইতোমধ্যে ১৪টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। চালু মিলগুলোও অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্মাণ খাত পুনরুজ্জীবিত না হলে রড শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বর্তমান সংকটের একটি বড় কারণ আস্থার ঘাটতি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ঝুঁকি নিতে চান না। নগরীর ব্যবসায়ী সুমন মল্লিক বলেন, মানুষ যদি নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে ব্যবসাও চলবে না। আমরা চাই স্থিতিশীলতাÑএটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, কিছু নির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলে নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
ইতিহাস বলে, নারায়ণগঞ্জ সহজে হার মানে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা কিংবা মহামারির মতো কঠিন সময়েও এই শহর বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ব্যবসায়ীরা সেই অভিজ্ঞতাকেই ভরসা করছেন। নতুন সরকারের নীতিগত সহায়তা, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে নারায়ণগঞ্জ আবারও তার পুরোনো ছন্দে ফিরবে, এমনটাই বিশ্বাস তাদের।
শিল্প, বাণিজ্য ও নদীবন্দরনির্ভর এই শহরের অর্থনৈতিক চাকা এখন ধীরগতিতে ঘুরছে। তবে সেই চাকা থেমে নেই। বরং নতুন গতি পাওয়ার অপেক্ষায় আছে সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক সময় এবং সঠিক নেতৃত্বের। সেই প্রত্যাশাতেই তাকিয়ে আছে নারায়ণগঞ্জের লাখো ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দেওভোগ লেকপার্কের পাশে বিকাল সাড়ে ৩টায় ভ্যানগাড়ি সাজিয়ে বসেছিলেন সবজি বিক্রেতা তাজুল মিয়া। একটি বড় লেবু বিক্রি করলেন ৪০ টাকায়। হতাশ কণ্ঠে তিনি বললেন, ভাই, রোজা গেল, ঈদ গেলÑবেচাকেনা নাই। দুই হাজার টাকার মাল আনি, সব বিক্রি হলে ২০০-৩০০ টাকা লাভ। এই টাকায় সংসার চলে?
কিছুটা সামনে জল্লারপাড় পুলের পাশে দুধ বিক্রেতা রমজান আলী জানান, এক মণ দুধ বিক্রি করতে পারলে ২০০ টাকা থাকে। রোজা গেল, দুধের চাহিদা নেই। ঘরভাড়া বাকি, পোলাপান নিয়ে কষ্টে আছি। পাশেই থাকা কলা বিক্রেতা কালু মিয়ার বক্তব্যও একইÑরাত অবধি বসে থেকেও ২০০ টাকার বেশি লাভ হয় না। ফুটপাতের এই চিত্রই এখন নগরীর সার্বিক বাস্তবতা। বিক্রি কম, ক্রেতা কম, লাভ কম; কিন্তু খরচ, ভাড়া, পরিবহন, পাইকারি দামÑসবই বাড়তি।
ফুটপাত থেকে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানÑবর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সবারই ব্যবসা খারাপ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এসেছে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন। নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের এই দুরবস্থা সমাজে নানা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। ছিনতাই বেড়ে গেছে। পকেট মাইর হচ্ছে। ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এছাড়া সাহায্যপ্রার্থী লোকজনের সংখ্যাও বেড়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। সিদ্ধিরগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগে একজন বিএনপি নেতাকেও আমরা গ্রেপ্তার করেছি। পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post