শেয়ার বিজ ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে বিদ্যুতের বিপুল চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তির এক বিশাল প্রসারের পরিকল্পনা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এই পরিকল্পনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েক দশকের পুরোনো পারমাণবিক বর্জ্য সমস্যা। এই সংকট সমাধানে মার্কিন সরকার এখন এক নতুন ও চমকপ্রদ কৌশল অবলম্বন করছে। যেসব অঙ্গরাজ্য স্থায়ীভাবে পারমাণবিক বর্জ্য নিজেদের ভূগর্ভে সংরক্ষণে রাজি হবে, তাদের জন্য কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। খবর রয়টার্স।
গত সপ্তাহে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ (ডিওই) প্রকাশিত এক প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সরকার এখন পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। নতুন এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিউক্লিয়ার লাইফসাইকেল ইনোভেশন ক্যাম্পাস’। এর আওতায় কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নতুন প্রজšে§র পারমাণবিক চুল্লি, বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট এবং বিশাল আকারের ডাটা সেন্টার-সবই একসঙ্গে স্থাপন করা হবে। অর্থাৎ যারা বর্জ্য নিতে রাজি হবে, তারা একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির এক বিশাল শিল্পাঞ্চল পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এক লাখ টনেরও বেশি তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক বর্জ্য জমা হয়ে আছে। এগুলো এখন অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে রাখা হয়েছে। এর আগে নেভাদার ইউক্কা মাউন্টেনে একটি স্থায়ী বর্জ্য সংরক্ষণাগার তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় মানুষের তীব্র বিরোধিতার মুখে তা ভেস্তে যায়। সেই প্রকল্পের পেছনে এরই মধ্যে প্রায় দেড় হাজার ডলার খরচ হয়ে গেছে।
পুরো বিষয়টি এখন স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্মতির ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। জ্বালানি বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসবে। সাবেক মার্কিন পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা লেক ব্যারেট বিষয়টিকে ‘বড় টোপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বর্জ্য কেন্দ্রের মতো একটি অপ্রীতিকর স্থাপনার পাশে যখন বড় বিনিয়োগের আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেওয়া হয়, তখন অনেক রাজ্যের জন্যই তা গ্রহণ করা সহজ হয়ে ওঠে।’
এরই মধ্যে ইউটাহ ও টেনেসির মতো অঙ্গরাজ্যগুলো এ বিষয়ে প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চার গুণ বাড়িয়ে ৪০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। মূলত এআই প্রযুক্তির ডাটা সেন্টার এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের চাহিদা মেটাতেই এই উদ্যোগ। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার ‘স্মল মডুলার রি-অ্যাক্টর’ (এসএমআর) নামের ছোট আকারের চুল্লি তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে।
এসএমআর প্রযুক্তি সাধারণ বড় প্ল্যান্টের চেয়ে দ্রুত ও কম খরচে তৈরি করা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নতুন প্রযুক্তি বর্জ্য সমস্যা সমাধান করবে না। বরং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই নতুন ধরনের চুল্লিগুলো বর্তমানের চেয়েও বেশি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি করতে পারে।
ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন পরিবেশবাদী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই তোড়জোড় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ওরচেস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সেথ টেলার বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান ছাড়া নতুন নকশার চুল্লি তৈরির এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বর্জ্যরে পরিমাণ কমানোর দাবিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।’
সমালোচকদের মতে, অতীতে যতবার এই চেষ্টা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অনিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
দেশটির জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে প্রায় ১১০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়েছেন, কারণ সরকার চুক্তি অনুযায়ী বর্জ্যগুলো সরিয়ে নিতে পারেনি। এই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য হাজার হাজার বছর ধরে পরিবেশ ও মানুষের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।
অঙ্গরাজ্যগুলোকে সরকারের এই প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো এলাকা এই ‘তেজস্ক্রিয় টোপ’ গ্রহণ করবে কি-না, তা এখন দেখার বিষয়। তবে বর্জ্য সমস্যার টেকসই সমাধান না হলে আমেরিকার এই পারমাণবিক স্বপ্নপূরণ হওয়া কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post