রাশেদ রুবেল : প্রযুক্তিপণ্য আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজির বিরুদ্ধে প্রযুক্তি ব্যবসার আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচার, ভুয়া বিলিং, অতিমূল্যায়িত আমদানি এবং ভ্যাট শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গাপুর, দুবাই, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ একাধিক দেশে সহযোগী কোম্পানি ও শেল ফার্ম গড়ে তুলে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা জুড়ে একটি আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে বলে অভিযোগ অছে। আর এর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। গত বছরের ২৫ মার্চ দুদকের পরিচালক সৈয়দ তাহসিনুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্মার্ট টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুর ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করছে। তবে তদন্তকাজে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগ অনেক বড়; তাই তদন্তে সময় লাগছে।
অভিযোগ উঠেছে, স্মার্ট টেকনোলজি ২০০৯ সালে সিঙ্গাপুরে ‘স্টারসিড টেকনোলজি’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে, যার প্রাথমিক মূলধন ছিল প্রায় ছয় মিলিয়ন (সিঙ্গাপুর ডলার)। এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ টাকা বিদেশে পাচার করে সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে।
একইভাবে দুবাইয়ে ‘সিমাল টেকনোলজি মিডল ইস্ট’ ও ‘টুইনমস টেকনোলজি মিডল ইস্ট’ নামে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি, কনসালটেন্সি চার্জ এবং ক্লাউড সেবার বিল দেখিয়ে অর্থ পাঠানো হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব সেবার অস্তিত্ব বা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ উদ্দিন খান শেয়ার বিজকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান যদি বিদেশে বিনিয়োগ করে, সেই অর্থ যদি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া যদি কেউ বিদেশে বিনিয়োগ করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করবে সেই অর্থ অবৈধ অর্থ। তা মানি লন্ডারিংয়ের শামিল বলে গণ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট বিদেশি বিনিয়োগ ও আয়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা পূর্ণাঙ্গ হিসাবের তথ্য সহজলভ্য নয়, যা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এমন বিষয়ে এনবিআরএর শুল্ক বিভাগের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, স্মার্ট টেকনোলজি আন্তর্জাতিক কয়েকটি ব্র্যান্ডের নাম ও নকশা ব্যবহার করে এলইডি টিভি ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানির সময় প্রকৃত মূল্য ও উৎস গোপন রাখে। এর ফলে সরকার বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ও শুল্ক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এছাড়া স্মার্ট ব্র্যান্ডের পণ্যে বিভ্রান্তিকর লেবেলিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভিযোগও রয়েছে, যা ভোক্তা অধিকার ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্ন তুলেছে।
জানা গেছে, স্মার্ট টেকনোলজি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার টেন্ডারে অংশ নিয়ে পণ্য সরবরাহ করেছে। সরকারের কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় দেখানো অর্থের সঙ্গে বাস্তবে সরবরাহ ও কাজের পরিমাণের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, বৈধ ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন পরিচালনার সুযোগ থাকায় এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন আড়ালে থাকতে পারে।
অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছরের মার্চে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে তার অবসর গ্রহণের কারণে তদন্তে গতি কমে যায় বলে জানা গেছে। এখন একজন সহকারী পরিচালক অভিযোগটি তদন্ত করছেন।
দুদকের একাধিক সূত্র বলছে, তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি দুর্নীতির মামলা তদন্তে ধীরগতির জন্য সংশয় দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে স্মার্ট টেকনোলজি ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলামের পেশাগত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানটিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুবিধা এনে দিয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে স্মার্ট টেকনোলজি কোম্পানির ওয়েবসাইটের দেওয়া ফোন নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যাবস্থাপনা পরিচালক বা তাদের কারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচাররোধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান শেয়ার বিজকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থপাচার ছিল আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা। নতুন সরকারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। এর কাঠামোগত কিছু বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সরকারকে সদিচ্ছা গ্রহণ করতে হবে।
স্মার্ট টেকনোলজির বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক আকতার হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post