হাসান শিরাজি: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিটি কেবল পণ্য লেনদেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ঢাকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর এক বিশ্লেষণে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাহ্যিকভাবে এটি বাজারে প্রবেশাধিকার বা মার্কেট অ্যাক্সেসের চুক্তি মনে হলেও, এর ভেতরের শর্তগুলো গভীরভাবে ভূরাজনৈতিক। এখানেই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের শুল্কমুক্ত বা সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং সম্প্রতি সেখানে শুল্ক বাড়ার একটি ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এর বিপরীতে বাংলাদেশকেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং বিমান, জ্বালানি (এলএনজি), গম, তুলাসহ বিভিন্ন পণ্য বেশি পরিমাণে কিনতে হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মূল চিন্তার জায়গাটি হলো চুক্তির কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক দিকগুলো। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে, এই নতুন চুক্তির বেশ কিছু শর্ত বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সীমিত করে দিতে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করার যে বিষয়গুলো চুক্তিতে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তা মূলত এশিয়ায় অন্যান্য পরাশক্তির প্রভাব কমানোর মার্কিন কৌশল। এর ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
দেশের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে তাড়াহুড়ো করে এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এমন একটি চুক্তি সই করা যৌক্তিক হয়নি। তাদের মতে, চুক্তিতে এমন কিছু অসম শর্ত রয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করতে পারে বা শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে নতুন করে শাস্তিমূলক শুল্ক বসাতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post