এফ আই মাসউদ: প্রাচীনকাল থেকে সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে গহনার ব্যবহার চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নকশা, উপকরণ ও ব্যবহার বদলালেও গহনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি একটুও। বিশেষ করে নারীদের কাছে গহনা শুধু অলংকার নয়, বরং তা ব্যক্তিত্ব, রুচি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন। সোনা ও রুপার পাশাপাশি এখন নানা ধাতু ও কৃত্রিম উপকরণেও তৈরি হচ্ছে আধুনিক নকশার গহনা। বাংলাদেশে রুপার গহনার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের ইতিহাস। একসময় গ্রাম-বাংলার নারীদের পায়ে শোভা পেত রুপার মল, যা ছিল সৌন্দর্যের পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদারও প্রতীক। শুধু অলংকার হিসেবেই নয়, অভিজাত পরিবারগুলোতে রুপার তৈরি পানবাটি, হুঁকো, থালা-বাসনও ব্যবহƒত হতো। সেই সময় রুপা ছিল দৈনন্দিন জীবনযাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সময়ের পরিবর্তনে কিছুটা ম্লান হয়ে গেলেও রুপার গহনার জনপ্রিয়তা আবারও ফিরে এসেছে নতুন আঙ্গিকে। আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন রুপার ওপর গোল্ডপ্লেটেড ডিজাইন, পাথর বসানো আংটি, চুড়ি, ব্রেসলেট ও গলার হার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী রুপার মল এখনও সমানভাবে আকর্ষণ ধরে রেখেছে। বিশেষ করে অক্সিডাইজড রঙের রুপার গহনার চাহিদা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি।
ফ্যাশন সচেতন নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের মাঝেও রুপার গহনার ব্যবহার বেড়েছে। রুপার ব্রেসলেট ও কানের রিং এখন পুরুষদের ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিক্রেতাদের মতে, তরুণ প্রজšে§র মধ্যে রুপার গহনার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
রুপার গহনার অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর বহুমুখিতা। প্রায় সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই এটি মানানসই। তবে ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোশাকের ধরন অনুযায়ী গহনা নির্বাচন করা জরুরি। যেমনÑ পাশ্চাত্য পোশাকের সঙ্গে হালকা ও মিনিমাল ডিজাইনের গহনা মানানসই, আর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে ভারী ও কারুকার্যখচিত গহনা বেশি মানায়।
রুপার গহনা ব্যবহার করেন সাবিহা। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রুপার গহনার একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। এটা খুব বেশি চাকচিক্যময় না, কিন্তু একদম এলিগ্যান্ট। অফিসে বা দৈনন্দিন জীবনে আমি রুপার গহনাই বেশি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’
মেহজাবিন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গোল্ডেন গহনা একটু হেভি লাগে আমার কাছে, কিন্তু রুপা খুব লাইট আর স্টাইলিশ। বিশেষ করে অক্সিডাইজড রুপার জুয়েলারিÑ এগুলো এখন ট্রেন্ডি, আর যেকোনো ড্রেসের সঙ্গে মানিয়ে যায়।’
রাশিদা নামের এক গৃহিণী বলেন, ‘রুপার গহনার একটা ঐতিহ্য আছে। ছোটবেলায় দেখতাম মা-খালারা এগুলো পরতেন। এখন আমিও পরিÑএকটা নস্টালজিক অনুভূতি কাজ করে।’
তানিয়া নামের এক উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি নিজেই রুপার গহনার ছোট ব্যবসা করি। অনেক নারী এখন রুপার দিকে ঝুঁকছেন, কারণ এটা সাশ্রয়ী, টেকসই এবং ডিজাইনেও বৈচিত্র্য আছে।’
ফ্রিল্যান্সার নুসরাত বলেন, ‘আমার স্কিনে গোল্ড বা অন্য মেটাল সবসময় স্যুট করে না, কিন্তু রুপা একদম পারফেক্ট। এটা আরামদায়ক, আর এলার্জির সমস্যাও কম হয়।’
ঢাকায় উন্নতমানের রুপার গহনা (সিলভার জুয়েলারি) চাঁদনী চক, বসুন্ধরা সিটি, ও মিরপুরের মত বড় শপিং মলগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। সিলভার হাউস (চাঁদনী চক), সিলভার গ্যালারি (নিউ মার্কেট), এবং রয়্যাল জুয়েলার্স (বসুন্ধরা সিটি) অন্যতম জনপ্রিয়। এ ছাড়া আড়ং এবং বিভিন্ন জুয়েলারি শোরুমগুলোতে খাঁটি ও গোল্ড পালিশ করা রুপার গহনা বিক্রি হয়।
বিশ্বে রুপার সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। দেশটিতে এই মূল্যবান ধাতব পণ্যটির আমদানি রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। মার্চ মাসে প্রায় ৮৩৬ টন রুপা আমদানি করেছে চীন, যা গত ১০ বছরের মার্চ মাসের গড় (প্রায় ৩০৬ টন) থেকে অনেক বেশি। মূলত খুচরা বিক্রেতা ও সোলার খাতে চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই দেশটিতে রুপা কেনা এতো বেশি বেড়েছে। ব্যবসা ও অর্থনীতিবিষয়ক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্ল–মবার্গের বরাত দিয়ে লাইভমিন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে সোলার খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হওয়ায় রুপার চাহিদা বাড়ছে। রুপা বিদ্যুৎ পরিবহনে অত্যন্ত কার্যকর, যা সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করে। এ কারণে সৌর প্যানেল তৈরিতে রুপা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া তুলনামূলক দাম কম হওয়ার কারণে বিকল্প হিসেবে অনেক বিনিয়োগকারী রুপার ছোট বার কিনছেন। একই সঙ্গে রপ্তানি কর সুবিধা শেষ হওয়ার আগে উৎপাদন বাড়াতে সৌর প্যানেল নির্মাতারাও বেশি করে রুপা সংগ্রহ করছে। বর্তমানে বৈশ্বিক রুপা সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই সৌরশক্তি খাতে ব্যবহƒত হয়, যার বড় অংশই চীনে।
দেশের সোনা-রুপার বাণিজ্যকেন্দ্র পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাঁতিবাজার। বহু আগেই বয়নশিল্পের পরিচয় ছাপিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে গহনার বৃহৎ অর্থনীতি। দিনভর খুচরা বিক্রির পাশাপাশি পাইকারি বেচাকেনা, দরকষাকষি ও দামের ওঠানামায় সরব থাকে পুরো এলাকা। ব্যবসায়ীদের মতে, সোনার চাহিদা থাকলেও বাজার সচল রাখে মূলত রুপার লেনদেন।
ইতিহাস বলছে, একসময় এই অঞ্চল ছিল তাঁতশিল্পের কেন্দ্র। মসলিন ও রেশমভিত্তিক বাণিজ্যের পতনের পর ধীরে ধীরে সোনা-রুপার ব্যবসা এখানে জায়গা করে নেয়। পেশা বদলে অনেক তাঁতি পরিবার গহনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে বাজারটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে বহু প্রজš§ ধরে ব্যবসা করে আসা পরিবারগুলোর আধিপত্য, যা একটি স্থিতিশীল কিন্তু সীমিত কাঠামো তৈরি করেছে।
সরকার সিলভার হাউস-এর মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও বাজারে প্রভাবশালী। এখানে নতুন ডিজাইনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নকশার চাহিদা শক্তিশালী। ‘কমল নূপুর’- পদ্মফুল অনুপ্রাণিত একটি ডিজাইন- বাজারে ধারাবাহিকভাবে ভালো বিক্রি হচ্ছে, যা ভোক্তাদের রুচিতে ঐতিহ্যের স্থায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রুপার গহনার প্রধান ক্রেতা মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তুলনামূলক কম দামের কারণে এই শ্রেণির কাছে রুপা একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প। তবে মূল্যস্ফীতি ও ধাতুর দামের ঊর্ধ্বগতিতে বাজারে সরাসরি প্রভাব পড়ছে। দাম বাড়লে বিক্রি কমে যায়, ফলে গহনা অনেক সময় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়।
কুমিল্লা সিলভার স্টোর-এর তথ্য অনুযায়ী, রুপার দাম ভরি প্রতি আনুমানিক ৫,৫০০ থেকে ৬,২০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
তাঁতিবাজারের ব্যবসার একটি বড় অংশ পাইকারি লেনদেননির্ভর। এখান থেকে গহনা দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, খুচরা বিক্রির তুলনায় পাইকারি বিক্রিই আয় ধরে রাখতে বেশি ভূমিকা রাখে। তবে লাভের মার্জিন সীমিত¬Ñ প্রতি ভরিতে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। ফলে উচ্চ বিক্রির ওপরই ব্যবসার স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান ড. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন শেয়ার বিজকে বলেন, রুপা আর রুপার তৈরি অলংকারÑ এ দুইটার মধ্যে পার্থক্য আছে।
আমরা রুপার তৈরি অলংকার বিক্রি করি। গোল্ডের দাম যা হইছে, তা তো মানুষ কিনতে পারে না। বিকল্প হিসেবে মানুষের একটা অর্নামেন্ট প্রয়োজন। পায়ের নূপুর থেকে শুরু করে এখন সবকিছুই রুপার রঙের তো আছেই।
দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, রুপার ওপরে গোল্ড প্লেট করা যায়। যেকোনো মেটালের উপরে গোল প্লেটিং করা যায়। রুপাকেও রুপার কালারে না রেখে অন্য ধরনের কালারে নিয়ে আসা যায় এবং কোয়ালিটিও ঠিকই থাকে। পিপলের কনসেপ্ট থেকে রুপা এখন লাক্সজারিয়াস গুডে পরিণত হয়েছে। বিয়েশাদি, গায়ে হলুদ, বৌভাত অনুষ্ঠানে এটির ব্যবহার বেড়েছে। বর্তমানে রুপার অলংকারের ব্যবহারটা বেড়েছে, সামনে আরও বাড়বে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post