আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিস মার্কেটস (বিএএসএম) নিজেই এখন কার্যক্রম ও নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে। প্রায় ছয় মাস ধরে স্থায়ী মহাপরিচালক (ডিজি) ছাড়াই অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস না করলেও প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বেতন-ভাতা নিচ্ছেন; যা নিয়ে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট মহলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন।
জানা গেছে, বিএএসএমের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী ২০২৫ সালের অক্টোবরে অবসরে যান। এরপর অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে বিএএসএমের চেয়ারে বসেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের আস্থাভান বিএসইসির প্রধান হিসাব কর্মকর্তা কামরুল এনাম খান। ৬ মাসের বেশি সময় ধরে তিনি মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, ‘এই সময় সপ্তাহে এক থেকে দুদিন কামরুল স্যার।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিএসইসির একটি সূত্র জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কমিটির প্রধান ও বিএসইসির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোয় বসিয়ে তাদের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিনিময়ে তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা কর্মকর্তাদের চাপে রাখাসহ কমিশনে একক কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন। তারই একটি উদাহরণ হচ্ছে বিএএসএমের মহাপরিচালক পদে দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস ধরে মহাপরিচালক পদে কামরুল এনাম খানকে রেখে দেওয়া। বিএএসএমের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, প্রতি মাসে বেতন-ভাতা হিসাবে কামরুল এনাম খান প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পান।প্রথম পৃষ্ঠার পর
ঘটনার সত্যতা জানতে সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার রাজধানী মতিঝিলের জীবন বীমা টাওয়ারের ১৫ তলায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি রুমে ক্লাস চলছে, অন্য রুমগুলো ফাঁকা। মহাপরিচালক এসেছেন কি না খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার হওয়ায় যারা অফিসে এসেছিলেন তারা সবাই বেলা ২টার আগেই চলে গেছেন। সেখানে অন্য কোনো শিক্ষকও কথা বলার মতো নেই বলে জানান একজন কর্মী। কাউন্সিলর বা ফ্যাকাল্টি সদস্যদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
সেখানে দায়িত্বরত স্টাফ অফিসার (পিও টু ডিজি) তাসনিয়া তাবাসসুম শেয়ার বিজকে বলেন, এই মুহূর্তে আপনাদের সঙ্গে কথা বলার মতো কেউ নেই। আপনারা কার্ড (ভিজিটিং কার্ড) দিয়ে গেলে আমি স্যারকে জানাব।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞারা বলছেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন অনুযায়ী তার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বৈধ। সে হিসেবে কামরুল এনাম সাহেব দায়িত্ব পালন করছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে কাউকে নিয়োগ ব্যতি রেখে অতিরিক্তি কাউকে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান চালিয়ে নেওয়া হবে অযৌক্তিক। এছাড়া তিনি পুঁজিবাজারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি দায়িত্বশীল পদে (চিফ অ্যাকাউন্ট ডিভিশন ও ইন্টারনাল অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স ডিভিশন) আছেন। তার বয়স ও অতিরিক্ত কাজের চাপ বিবেচনায় নিলে শরীরিক সুস্থতা ও কাজের দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির কাউন্সিলর সদস্য ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বিএএসএমের স্থায়ী ডিজি শিগগিরই নিয়োগ দেওয়া হবে। আমি যতদূর জানি ইতোমধ্যে ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে ডিজি নেওয়া হতে পারে।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটসের (বিএএসএম) মহাপরিচালক পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এদিকে বিএএসএমের মহাপরিচালক কামরুল এনামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তার সহকারী তাসনিয়া তাবাসসুম শেয়ার বিজ প্রতিবেদককে খুদেবার্তার মাধ্যমে জানান, এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে বিএসইসির মুখপাত্র বক্তব্য দেবেন।
পরে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ডিরেক্টর জেনারেল কামরুল এনাম খান এফসিএমএ অতিরিক্ত হিসেবে বিএএসএমে অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিএসইসির পাশাপাশি বিএএসএমের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রয়োজন পড়লেই তিনি সশরীরে বিএএসএমে যান। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্লেখ্য, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের অপসারণের দাবিতে ‘কাফন মিছিল’ করেছেন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) ব্যানারে বিনিয়োগাকারীরা। এছাড়া সংগঠনটি বিএসইসি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সংগঠনটি সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকা অবস্থায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল, ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজু ও এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমামের নেতৃত্বাধীন সংঘবদ্ধ আর্থিক দুর্নীতি চক্রের বিরুদ্ধে কিছুই করেননি। উল্টো সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। এসব কারণে অন্যদেরসহ তার বিরুদ্ধে দুদকে ২৬৪ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের তদন্ত শুরু হয়েছে। তার এই দুর্নীতি দ্রুত অনুসন্ধান করে তাকে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
দুদকে জমা দেওয়া ওই লিখিত অভিযোগে সংগঠনটি জানায়, দেশ, মানুষ ও পুঁজিবাজারের স্বার্থে বিএসইসির দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের ওই পদে থাকাটা অনৈতিক। তাই সব বিনিয়োগকারী এরকম একজন অর্থ আত্মসাৎকারী, ব্যাংক লোপাটকারি দুর্নীতিবাজ অফিসারের দুর্নীতি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত তার নেতৃত্বাধীন কমিশন পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানির আইপিও আনতে পারেননি। এছাড়া বেশকিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর দীর্ঘদিন ধরে ফেসভ্যালুর নিচে থাকলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post