এস. এম. রুবেল, কক্সবাজার : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মাতারবাড়ির পাশাপাশি কর্ম হারানোর প্রভাব পড়েছে ধলঘাটা, কালারমারছড়া ও হোয়ানক ইউনিয়নেও। ২০১৯ সালে ইপসা ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের জরিপে উঠে আসে, প্রকল্পের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ২২-২৪ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তবে এখন সেই সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
জানা গেছে, প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে ১ হাজার ৪১৪ দশমিক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ একর জমি দখল ও অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এতে লবণ চাষ, মাছ ও কাঁকড়া ধরা ও কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, শুধু লবণচাষ খাতে ৫-৭ হাজার চাষি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আগে একজন লবণচাষি বার্ষিক গড়ে ৩-৪ লাখ টাকা আয় করলেও বর্তমানে তা কমে ৬০ হাজার টাকার নিচে নেমেছে। এই আয়হ্রাসের ফলে জীবিকা হারানো পরিবারগুলো এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শুধু ফায়তং ও লামা এলাকায় প্রায় তিন-চারশত পরিবার স্থানচ্যুত হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহর সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প ও নারীদের গার্মেন্টসে প্রায় ৭ শতাধিক মানুষ জীবিকার সন্ধানে চলে গেছে।
নদী ও সাগরনির্ভর জেলেদেরও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোহেলিয়া নদী ভরাট এবং নৌপথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। স্থানীয় জেলে সংগঠনের নেতারা জানান, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার জেলে তাদের জীবিকা হারিয়েছেন। এ অবস্থায় অনেকেই পেশা বদলে দিনমজুরি বা ভাড়াটে শ্রমিকের কাজ করছেন।
মহেশখালী জনসুরক্ষা মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মহসিন বলেন, ‘প্রকল্পের কারণে লবণচাষি, জেলে, দিনমজুরসহ অন্তত ২১ শ্রেণির মানুষ কর্মহীন হয়েছে। লবণ জমি দখল এবং কোহেলিয়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের স্থানীয় নেতা আবু বক্কর জানান, ‘নদী ভরাটের কারণে মাছ ধরার সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অন্তত ৫ হাজার জেলে ইতোমধ্যে কাজ হারিয়েছে। যদি নদী রক্ষা না হয়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও বহু পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়বে।’
স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাজে এক সময় ১৫ থেকে ১৮ হাজার মানুষ কাজ করতেন। যেখানে স্থানীয় শ্রমিক ছিলেন মাত্র ২ হাজারের মতো। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এখন প্রকল্পে মোট কত কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন সেই তথ্য দিচ্ছেন না প্রকল্পের দায়িত্বশীলরা। তবে স্থানীয়রা বলছেন, মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জন স্থানীয় শ্রমিক অস্থায়ীভাবে প্রকল্পে কাজ করেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘প্রকল্প নির্মাণের জায়গায় আমিসহ ৪৪ পরিবার বসবাস করতাম। ক্ষতিপূরণ, স্থায়ী চাকরি ও পুনর্বাসনের আশ্বাসে আমাদের উচ্ছেদ করা হলেও কর্তৃপক্ষ চুক্তিপূরণ করেননি। তিনি বলেন, এখন ৪৪ পরিবারের কারও চাকরি নাই, কাজ নাই, ছোট্ট দুই রুমের ঘর তৈরি করে দিলেও জমির দলিল দেয়নি। বর্তমানে অনাহারে অর্ধহারে দিনাতিপাত করছেন।’
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আবদুল জাব্বার বলেন, ‘আমার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলেও এখনও ঘর করে দেননি। ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেও ক্ষতিপূরণ পাইনি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ জানান, মাতারবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন বিভিন্ন সময় স্মারকলিপি দিয়েছেন, সেটা ঊর্ধ্বতনদের জানানোর পাশাপাশি প্রকল্পের দায়িত্বশীলদের অবগত করেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প প্রায়ই পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের যুক্তি দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক সময় সেটি ঘটে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রকল্পের ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণে স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের ক্ষতির দিকটি কতটা বিবেচনায় নেয়া হয় এবং সরকারের আন্তরিকতার ওপর প্রকল্প-পরবর্তী পরিস্থিতি কতটা নির্ভরশীল।
তার মতে, নৈতিকভাবে সরকারের দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত ক্ষতিপূরণ, বিকল্প জীবিকার সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন, উদ্যোক্তাদের ঋণসহায়তা ও বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিতদের জন্য উপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় কেন্দ গুলো যথাযথ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের বিকল্প জীবিকা সৃষ্টিতে নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। নাগরিক সমাজ যেমন সচেতনতা তৈরি করবে, তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে।
অপরদিকে, মাতারবাড়ি আল্ট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার্ড পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে ফোন ও ইমেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post