শিক্ষা ডেস্ক: শীতের সকাল। ঘড়ির কাঁটায় তখনো ৭টা বাজেনি। ঢাকার রাস্তায় কুয়াশা আর ব্যস্ততার মিশেল। ১০ বছরের ছোট্ট আয়ান হাই তুলতে তুলতে স্কুলের ভ্যানে উঠছে। পিঠে তার নিজের ওজনের চেয়েও ভারী একখানা স্কুলব্যাগ। আয়ানের দিন শুরু হয় বইয়ের বোঝা দিয়ে, আর শেষ হয় রাত ১১টায়Ñকোচিং, প্রাইভেট টিউটর আর গাদা গাদা হোমওয়ার্কের পড়া মুখস্থ করে। আয়ান মাঠে খেলতে ভুলে গেছে, আকাশ দেখতে ভুলে গেছে। সে শুধু জানে তাকে পরীক্ষায় যে কোনো মূল্যে ‘জিপিএ-৫’ পেতে হবে।
অন্যদিকে, হাজার মাইল দূরের দেশ ফিনল্যান্ড বা জাপানের আরেকটা শিশুর কথা ভাবুন। তাদের ব্যাগে বইয়ের চেয়ে খাতা, রঙের পেন্সিল আর খেলার সরঞ্জাম বেশি থাকে। তারা ক্লাসে গিয়ে দলবেঁধে গাছ লাগাতে শেখে, অঙ্কের পাজল মেলায়, বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ছোট ছোট বাস্তব সমস্যার সমাধান করে, এমনকি নিজেদের ক্লাসরুম নিজেরা পরিষ্কার করে। তাদের কোনো জিপিএ-৫ পাওয়ার ইঁদুর দৌড় নেই, কোচিং সেন্টারের দিকে ছুটে চলার ক্লান্তি নেই। অথচ দিনশেষে বিশ্বের যেকোনো সূচকে তারাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে দক্ষ, সুখী ও সৃজনশীল মানবসম্পদ।
এই দুটি চিত্র আসলে আমাদের এক চরম ও কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি আয়ানদের এভাবেই মুখস্থবিদ্যার ঘানির বলদ বানাতে থাকব? নাকি এখনই সময় আমাদের পুরো স্কুল শিক্ষাব্যবস্থাকে খোলনলচে বদলে ফেলে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার? উত্তরটা খুব সোজাÑসময়টা এখনই। এখন না পারলে আমাদের আর কখনোই পারা হবে না।
কেন ‘এখনই বা কখনোই নয়’: আমরা এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আছি। এটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। পৃথিবী এমন এক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যা মানব ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। আজ যে শিশুটি ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হচ্ছে, আজ থেকে ১৫ বছর পর সে যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, তখন আজকের প্রচলিত ৭০ শতাংশ চাকরিই আর পৃথিবীতে থাকবে না। এআই এবং রোবট সেই জায়গা দখল করে নেবে।
তাহলে আমাদের সন্তানরা কী করবে? তারা যদি কেবল বইয়ের পাতা মুখস্থ করে আর রোবটের মতো তথ্য উগড়ে দেওয়া শেখে, তবে তারা যন্ত্রের কাছে হেরে যাবে। কারণ মুখস্থ রাখা আর দ্রুত হিসাব করার ক্ষমতায় মানুষ কখনোই কম্পিউটারের সাথে পারবে না। আগামীর পৃথিবীতে তারাই টিকবে যাদের ভেতরে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তাক্ষমতা আছে, যাদের ভেতরে আবেগ (ঊসঢ়ধঃযু) আছে, যারা নতুন পরিস্থিতিতে দ্রুত মানিয়ে নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে পারে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি এই দক্ষতাগুলো শেখাচ্ছে? বুক হাত দিয়ে বলতে পারি, শেখাচ্ছে না। তাই এখনই আমাদের স্কুল শিক্ষাকে বিশ্বমানের করে ঢেলে সাজাতে হবে। এটি শুধু শিক্ষার বিষয় নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার লড়াই।
নীতিনির্ধারকদের জন্য সুস্পষ্ট রূপরেখা: যে কোনো বড় পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর সঠিক দিকনির্দেশনা। আমাদের শিক্ষানীতি ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত কিছু গাইডলাইন তুলে ধরা হলো:
১. শিক্ষকদের মান, সম্মান ও বেতনÑসবচেয়ে বড় বিনিয়োগ:
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই সে দেশের শিক্ষকদের মানের চেয়ে উন্নত হতে পারে না। ফিনল্যান্ডে সবচেয়ে মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা শিক্ষকতা পেশায় আসেন। আর আমাদের দেশে? চরম সত্যটি হলো, অন্য সব জায়গায় চাকরি না পেয়ে অনেকে প্রাইমারি বা হাইস্কুলের শিক্ষক হন। এর মূল কারণ সামাজিক মর্যাদা ও বেতনকাঠামো।
করণীয়: শিক্ষকদের বেতনকাঠামো এমন করতে হবে যেন তা ব্যাংক বা বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তাদের সমকক্ষ হয়। একজন শিক্ষক যেন শুধু শিক্ষকতা করেই সচ্ছলভাবে জীবন কাটাতে পারেন, তাকে যেন প্রাইভেট পড়ানোর জন্য ছুটতে না হয়। একইসঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে চরম কড়াকড়ি এবং নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. কারিকুলাম ও সিলেবাস: আমাদের বর্তমান সিলেবাস তথ্যনির্ভর। কে, কবে, কোথায় জš§গ্রহণ করেছেÑএসব মুখস্থ করার কোনো মানে নেই। কারণ গুগল করলে এক সেকেন্ডেই এসব জানা যায়।
করণীয়: পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ও আকার অর্ধেক কমিয়ে আনতে হবে। ‘প্রজেক্ট বেসড লার্নিং’ বা হাতে-কলমে কাজ শেখাতে হবে। যেমনÑবিজ্ঞানের বইয়ে শুধু পরিবেশ দূষণের কথা না পড়ে, বাচ্চারা নিজেরা তাদের স্কুলের চারপাশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রজেক্ট করবে। ইতিহাস পড়ার সময় তারা শুধু সাল মুখস্থ না করে, সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ক্লাসে নাটক করবে। শেখার প্রক্রিয়াটা হতে হবে আনন্দময়।
৩. ‘জিপিএ-৫’ নামক সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি: আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাকেন্দ্রিক। একটি তিন ঘণ্টার পরীক্ষা কখনোই একটি শিশুর আসল মেধা যাচাই করতে পারে না। এটি কেবল তার মুখস্থবিদ্যা যাচাই করে।
করণীয়: তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রথাগত পরীক্ষাই থাকা উচিত নয়। এর পরের ক্লাসগুলোতেও পরীক্ষার খাতার নম্বরকে মূল ভিত্তি না ধরে ‘ধারাবাহিক মূল্যায়ন’ চালু করতে হবে। একটি শিশু সারা বছর ক্লাসে কেমন আচরণ করছে, দলের সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারছে কি না, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কি না, তার যোগাযোগের দক্ষতা কেমনÑএই সবকিছু হবে মূল্যায়নের ভিত্তি। জিপিএ বা গ্রেডিং পদ্ধতি তুলে দিয়ে দক্ষতাভিত্তিক রিপোর্ট কার্ড দিতে হবে।
৪. গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর করাÑপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার:
ঢাকার একটি নামকরা স্কুলের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কুড়িগ্রামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীর আকাশ-পাতাল তফাত। এই বৈষম্য একটি জাতির জন্য ভয়ংকর।
করণীয়: অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি স্কুলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ক্লাসরুম নিশ্চিত করতে হবে। যেন ঢাকা বা বিদেশের একজন সেরা শিক্ষকের ক্লাস গ্রামের শিশুটিও তার স্মার্টবোর্ডে বসে দেখতে ও শিখতে পারে।
স্কুলগুলোয় আধুনিক সায়েন্স ল্যাব, লাইব্রেরি ও খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু ইট-সিমেন্টের ভবন বানালেই হবে না, ভেতরে প্রাণের সঞ্চার করতে হবে।
৫. স্কুল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা বিকেন্দ্রীকরণ:
ঢাকা থেকে বসে সেন্ট্রালি সারাদেশের হাজার হাজার স্কুল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে এবং জবাবদিহিতা কমে।
করণীয়: স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিকে স্কুল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুলের পরিচালনায় অভিভাবক, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী এবং শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বোর্ড থাকবে, যারা ওই নির্দিষ্ট এলাকার চাহিদা অনুযায়ী স্কুলের মান উন্নয়নে কাজ করবে।
সবার জন্য গাইডলাইন: অভিভাবক ও সমাজের ভূমিকা
স্কুলশিক্ষাকে বিশ্বমানের করতে হলে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে, বিশেষ করে অভিভাবকদের মানসিকতায় বিশাল পরিবর্তন আনতে হবে।
ইঁদুর দৌড় থেকে সন্তানকে বের করে আনুন: পাশের বাড়ির ছেলের চেয়ে আপনার সন্তান অঙ্কে দুই নম্বর কম পেয়েছে বলে তাকে বকাঝকা করা বন্ধ করুন। সবার মেধা এক রকম হয় না। আপনার সন্তান হয়তো অঙ্কে কাঁচা, কিন্তু সে হয়তো দারুণ ছবি আঁকে বা খুব ভালো নেতৃত্ব দিতে পারে। তার সেই ভেতরের শক্তিটাকে খুঁজুন।
প্রশ্ন করতে দিন: শিশুরা জš§গতভাবেই কৌতূহলী হয়। আমাদের সমাজ ও স্কুল ধমক দিয়ে তাদের প্রশ্ন করা থামিয়ে দেয়। সন্তানকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করুন। সে ভুল করুক, ভুল থেকেই সে শিখবে।
জীবনমুখী শিক্ষা দিন: শুধু বইয়ের পোকায় পরিণত না করে সন্তানকে ঘরের কাজ শেখান। নিজের বিছানা গোছানো, নিজের প্লেট ধোয়া, গাছে পানি দেওয়াÑএগুলো শিক্ষারই অংশ। তাকে মানুষের সঙ্গে মিশতে দিন, প্রকৃতির কাছে নিয়ে যান।
শেষ কথা: আমরা যদি আজই ঘুরে না দাঁড়াই, তবে আমরা এমন এক প্রজš§ তৈরি করব যারা শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এবং আগামী দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় পুরোপুরি অযোগ্য।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো আয়ানের কথা! সেই আয়ান, যে সকালে হাসিমুখে স্কুলে যাচ্ছে। তার পিঠে কোনো ভারী ব্যাগ নেই। সে স্কুলে গিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে মিলে একটি ছোট রোবট বানাচ্ছে বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তর্ক করছে। শিক্ষকের সঙ্গে সে হাসিমুখে কথা বলছে, কোনো ভয় ছাড়া। বিকালে স্কুল শেষে মাঠে এক চোট ফুটবল খেলে তবেই সে বাড়ি ফিরছে। তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে নতুন কিছু শেখার উত্তেজনা।
এমন একটি স্কুল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কি খুব কঠিন? হয়তো চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু মোটেও অসম্ভব নয়। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনাম পারলে আমরা কেন পারব না? আমাদের মেধার অভাব নেই, অভাব শুধু একটি সাহসী উদ্যোগের।
যে শিশুটি আগামীর বাংলাদেশের হাল ধরবে, তার শিক্ষার ভিত্তিটা আজকেই শক্ত করতে হবে। বিশ্বমানের স্কুল শিক্ষা আর কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়, এটি এখন আমাদের টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার। সময় এখনই। আসুন, মুখস্থবিদ্যাকে বিদায় জানিয়ে, প্রকৃত শিক্ষার এক নতুন ভোর আনি। কারণ, এখন না পারলে, আমাদের আর কখনোই পারা হবে না।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post