আল–আমিন ইসলাম : বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বেগম খালেদা জিয়া একটি অনন্য নাম। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যার কণ্ঠ স্বর সর্বদাই ছিল আপসহীন। বেগম জিয়ার নাম এলেই দেশপ্রেমী, আধিপত্যবাদ বিরোধী, ফ্যাসিবাদ বিরোধী এক লড়াকু সেনানীর চরিত্র ভেসে ওঠে। দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অতন্দ্র প্রহরী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের পুনর্প্রতিষ্ঠার জন্য বার বার কারাবরণ করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে ছিলেন সর্বদা এক নিবেদিত প্রাণ। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশের মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আন্দোলনের প্রধান চরিত্র। মিথ্যা মামলায় বার বার কারাবরণ করেও যিনি ক্ষমতার সঙ্গে কখনোই আপস করেননি, গণতন্ত্রের প্রশ্নে সর্বদাই ছিলেন সাহসী। দেশবাসীর জন্য শত নির্যাতন সহ্য করেও যিনি দেশের মানুষকে ছেড়ে কোথাও যান নাই। লোক দেখানো দেশপ্রেম নয় বরং বেগম জিয়ার ব্যক্তব্যে বার বার উঠে এসেছে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে ও পটপরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীদের সেকেন্ড হোমে চলে যাওয়ার প্রচলিত ধারা কে ভেঙে দেন বেগম জিয়া। ক্ষমতা নয় বরং এই দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের কাজ করাই ছিল তার রাজনীতি। দেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তিনি তার কথা রেখেছেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ পারি দেন না ফেরার দেশে। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে বেগম জিয়া হয়ে উঠেছিলেন দল, মত নির্বিশেষে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা সকল রাজনৈতিক দলের মুরব্বি। তার আপসহীন নেতৃত্ব, স্বল্পভাষী কথা বলার ধরন, সবার সঙ্গে নমনীয় ব্যবহার, আর পোশাকে আশাকে শালীনতার ছাপ তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পৌঁছে দেয় অন্যান্য উচ্চতায়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধ ধারণ করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের তৈরি দল বিএনপিকে সংগঠিত করে দীর্ঘ ৪৩ বছরের পথচলায় ছিল দল ও দেশের মাতৃ ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা খানম পুতুল। এরপর ১৯৬০ সালে তৎকালীন আর্মি অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার নাম ওঠে খালেদা জিয়া। একজন পুরোদস্তুর গৃহিণী থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথটা ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের। ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাসের মাথায় বিএনপির নেতাকর্মীদের অনুরোধে ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন বেগম জিয়া। খালেদা জিয়ার রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে এক বিপদ সংকুল অবস্থায়। তখন খালেদা জিয়া স্বামীহারা দৃঢ় নারী। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন যখন শুরু করেন তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল জেনারেল এরশাদ। ক্ষমতাচ্যুত বিএনপি তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন নেতাকর্মীদের দল ত্যাগে চরমভাবে বিপর্যস্ত। বেগম জিয়া দায়িত্ব গ্রহণের পর দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলে নিয়ে নেতাকর্মীদের একত্রিত করে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিতা করার জন্য কাজ শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে এরশাদে পাতানো একতরফা নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশগ্রহণ না করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার লড়াইয়ে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন। এ সময় রাজপথেই ছিল তার বিচরণ, জনগণেই ছিল সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও ভরসা। বেগম জিয়ার পরনে ভুসনে ছিলেন সাদামাটা আর দেশ আর গণতন্ত্রের প্রশ্নে ছিলেন ইস্পাত দৃঢ়তা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মিছিলে সম্যুক সারিতে নেতৃত্বে দেওয়া খালেদা সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। এ সময় সবার চাওয়া ছিল গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক। এ আন্দোলনে দেশের আপামর ছাত্র-জনতা যুক্ত হয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন শেখ হাসিনা ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটে।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ৭ বছরে তিনি বন্দি হন ৭ বার। এমন সময় বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ৯ বছরের আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নিজের ও দলের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন। এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে দেশের জনগণ কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে বেগম জিয়া। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে খালেদা জিয়া। তার সময়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রাতিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কান্ডারী বেগম জিয়া ছিলেন সর্বদা সৎ প্রকৃত দেশপ্রেমিক। বেগম জিয়ার পরিশ্রম, গভীর দেশপ্রেম অন্যান্য নেতৃত্ব গুণাবলী দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের কাছে বেগম জিয়া হয়ে ওঠেন সকলের আস্থার প্রতীক। তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব, সিদ্ধান্তে অবিচল থাকার নীতি, হাল না ছাড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা রাজনীতিতে তার অবস্থান করে তোলো শক্তিশালী। তার নেতৃত্বাধীন সরকারে আমলে নারী শিক্ষা ব্যবস্থা ও নারী নেতৃত্বে ও ক্ষমতায়ন, উপবৃত্তি প্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন, খাদ্যের অভাব দূরকরণে নেওয়া পদক্ষেপ সবসময় ছিল প্রশংসনীয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গার্মেন্ট শিল্পের প্রসারে কাজ করেন বিএনপি সরকার। বৈদেশিক নীতিতে বেগম জিয়া সবসময় অন্য দেশকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে দেখছে। বন্ধুর বেশে আধিপত্য সৃষ্টিকারী কাউকে তিনি কখনো প্রশ্রয় দেননি। কারও প্রভুত্ব কে মেনে নিতে দেয়নি।
২০০১ থেকে ২০০৬ বিএনপির সরকার পরিচালনার সময় রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আন্তর্জাতিক চাপ, দুর্নীতির সূচক প্রকাশসহ নানামুখী সংকটের মধ্যে পড়েন। সেনাসমর্থিত ১/১১ সরকারের শাসনামলে খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তান কে দুর্নীতির দায়ে আটক করা হয় । সেই সময় বিএনপি কে ভাঙার চেষ্টা করা হলে তিনি গণতন্ত্র ও নীতির প্রশ্নে সর্বদা অটল থেকে কোনো সমঝোতায় রাজি হয়নি। ২০০৯ এর নির্বাচনে বিএনপি সংসদে বিরোধী হলেও শেখ হাসিনা বিএনপি ও খালেদা নিয়ে একপাক্ষিক খেলা শুরু করে। বিএনপি কে মাঠে নানাভাবে দমিয়ে রেখে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কে বাতিল করেন এবং দলীয় সরকারের প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন চালু করলে খালেদা জিয়া প্রতিবাদ করেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে ভোটারবিহীন নির্বাচন, হত্যা, খুন, গুম, বিদেশে টাকা পাচার বিরুদ্ধে সব সময় কথা বলে গেছেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী সরকারের শাসনামলে ২০১৪ ও ২০২৪ এর নির্বাচন পুরোপুরি বর্জন করেন বিএনপি। শত জেল, জুলুম নির্যাতন সহ্য করেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে কখনোই ক্ষমতার সঙ্গে আপস করেননি খালেদা জিয়া ও তার দল। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ২০২০ সালের মার্চ মাসের গৃহবন্দি করে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয় হাসিনা সরকার। রাজনীতিতে তার সকল ধরনের সম্পর্ক তা নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারে পতন ঘটলে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে খালেদা জিয়া কে মুক্তি দেওয়া হয়। কারাগারে নিঃসঙ্গ থাকাকালীন খালেদা জিয়া কয়েকবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেলে পরিবারের আবেদন করা শর্তে ও তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিতে দেয়নি হাসিনা সরকার। ২৭ নভেম্বর ২০২৫ খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পায়। কয়েকবছর ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে উন্নত চিকিৎসা নিলেও আবারো গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার এবারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ইন্তেকাল করেন। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ যখন একটি নতুন বাংলাদেশ পায় তখন দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন খালেদা জিয়া। সকল দল মত নির্বিশেষে খালেদা জিয়া ২৪ পরবর্তী সময়ে সকলের রাজনৈতিক অভিভাবক হয়ে ওঠেন। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল, জুলুম নির্যাতনের ইতিহাস নতুন করে তরুণ প্রজন্মের সামনে আসে। খালেদা জিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের নজির নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেম উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন রাজনীতি শিক্ষক, যার থেকে শেখার অনেক কিছুই ছিল নতুন প্রজন্মের। মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে খালেদা জিয়ার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশ পন্থি প্রতিটি মানুষের হূদয়ে। খালেদা জিয়ার রাজনীতির মুল ভিত্তি ছিল প্রতিরোধ, গণতন্ত্র রক্ষা, অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করা। ক্ষমতা নয় বরং জনতার কাতার থেকে খালেদা জিয়া বুঝতে পারতেন জনগণের মনের কথা। দেশের মাটি আঁকড়ে ধরে দেশের কল্যাণের জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গিয়ে খালেদা জিয়া জনগণের মনি কোঠায় স্থান করে নিয়েছে। তাই তো বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের মাতম চলছে সারাদেশে। একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিকের মৃত্যু তে শোকাহত সারাদেশ। মাতৃভূমি হয়েছে মাতৃহারা। খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্তই তার কফিনের পাশে দাঁড় করিয়েছে সারা দেশবাসীকে। দল মত নির্বিশেষে সব শ্রেণির পেশার মানুষের শ্রদ্ধা ও দোয়ায় সিক্ত খালেদা জিয়া। এক শহর মানুষের জানাজায় অংশগ্রহণ ও সারাদেশের মানুষের মোনাজাতে এক গৌরবময় রাজকীয় বিদায় খালেদা জিয়ার।
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post