নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের জট খুলতে শুরু করেছে। এখন বিশ্বের বড় বড় ফান্ড ম্যানেজার বিনিয়োগকারীরা দেশের পুঁজিবাজারের প্রতি স্বেচ্ছায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে বাংলাদেশকে ‘হটস্পট’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতারণা ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উদাসীনতায় বাজার থেকে অনেক বিনিয়োগকারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল । কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজার নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করার পরই বাজারে আবারও বিনিয়োগকারীরা ফিরছেন। একইসঙ্গে টানা দুই বছর নিম্নমুখী থাকার পর চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে তারা বেশি শেয়ার বিক্রি করতেন, এখন সেই প্রবণতা কমে গিয়ে কেনার দিকে ঝুঁকছেন। এতে বাজারে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
এদিকে গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) আয়োজনে ‘এফএআর সামিট’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন
ও প্রতারণার (ফলস রিপ্রেজেন্টেশন) মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে ভালো ও মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়েছে।
অব
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও ইনি কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) যৌথ সহযোগিতায় এই সামিট হয়। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘ট্রাস্টওয়ার্দি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং : হোয়াট রিয়েলি ম্যাটার্স’। অর্থমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি অস্থির সময় পার করেছে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, তদারকি ব্যবস্থা ও ওয়াচডগ বডিগুলো (তদারকি সংস্থাগুলো) প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এর ফলে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং দুর্বল কোম্পানিগুলো মিথ্যা রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায় । অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, যখন বিনিয়োগকারীরা অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা হারায়, তখন বাজারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে ভালো কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্ত হতে চায় না। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হিসাববিদদের ‘সেলফ রেগুলেশন’ বা স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী। আমির খসরু বলেন, কোনো রেগুলেটরি বডির পক্ষে প্রতিদিন সব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম
সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ও কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসদের নিজেদের পেশাগত সততা বজায় রেখে সঠিক আর্থিক চিত্র তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। এফআরসি, আইসিএবি ও আইসিএমএবি কীভাবে কাজ করছে, তার ওপর দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বর্তমান অর্থমন্ত্রী বলেন, একসময় বিজিএমইএকে ইউডি সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে সফলতা পাওয়া গিয়েছিল। একইভাবে পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; নিজেদের সদস্যরা সঠিক অডিট করছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বড় বড় ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগান চেজসহ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে আসতে চায় । সরকার হংকং ও লন্ডনে বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড চালুর পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি দেশে ডোমেস্টিক বন্ড মার্কেটও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে সতর্ক করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন ছাড়া বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীরা যদি অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা না পায়, তাহলে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না।’ অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, একটি দেশে যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয়। তবে বিগত কয়েক বছরের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরকারের প্রতি আস্থা দেখিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ধরে রাখা জরুরি।
বিদেশি ও দেশীয় উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের এই আস্থা বজায় রাখতে সরকারকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজার উন্নয়নে পৃথক পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য—দেশের অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তর করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডিএসইও নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করছে । তিনি বলেন, একটি স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান দায়িত্ব তিনটি—সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে লেনদেন পরিচালনা, কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা এবং বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা অনিয়ম শনাক্ত হলে তা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করা। বর্তমানে ডিএসই এসব কার্যক্রম আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post