নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্ববাজারে বেড়েই চলেছে সোনার দাম। হু-হু করে বেড়ে বিশ্ববাজারে সোনার দামে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত বৃহস্পতিবার স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩১৬ দশমিক ৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সেশনের শুরুতে ৪ হাজার ৩১৮ দশমিক ৭৫ ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করেছিল। খবর: বিবিসি বাংলা।
এদিকে স্বর্ণের দাম সব দেশেই বাড়ছে। তবে পাশের দেশ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় দাম বেশি বাংলাদেশে। দুই বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে এই ধাতুর মূল্য বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১.১০ গ্রাম) চার হাজার ২০০ ডলারের ঘরে পৌঁছায়।
মাত্র তিন বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের শুরুতে যা ছিল দুই হাজার ডলারের নিচে। ২০২৩ সালের পর থেকে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কেবলই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বর্ণের দাম বেড়েছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়।
দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের অক্টোবরে হয়েছে দুই লাখের বেশি, যা বর্তমানে ভরি প্রতি দুই লাখ ১৬ হাজার ৩৩৩ টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দাম নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থাৎ যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দামে এক ধরনের প্রভাব পড়ে।
আর এ কারণেই কভিডের পর বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলমান থাকায় স্বর্ণের দাম আর কমেনি।
তবে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতির দুর্বলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার মানের পতন এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা করার প্রবণতাকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর ধারাবাহিকতায় স্বর্ণ যে কোনো সময় দাম বেড়ে দেশের বাজারেও নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে রুপাও সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে, স্পট রুপার দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫৪ দশমিক ৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সেশনের শুরুতে ৫৬ দশমিক ১৫ ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একইসঙ্গে চলতি মাসে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর প্রত্যাশাও দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। মার্কেটপালস বাই ওএএনডিএ’র বিশ্লেষক জেইন ভাওদা বলেন, স্বর্ণের দাম ২০২৬ সালের দিকে সুদের হার কমানোর পরিস্থিতি এবং মার্কিন-চীন সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
তিনি সতর্ক করেন, ‘যদি চুক্তি না হয় এবং উত্তেজনা অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার অতিক্রম করতে পারে।’ ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সুদের হার কমানোর আগ্রহ, কেন্দ ীয় ব্যাংকের ক্রয়, ডলারের বিমুদ্রাকরণ এবং শক্তিশালী ইটিএফ প্রবাহের কারণে স্বর্ণের দাম গত বছর থেকে ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা অক্টোবরে ফেডারেল রিজার্ভের ২৫ বেসিস-পয়েন্ট হার কমানোর পরিকল্পনা করছেন, যার সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ। এইচএসবিসি তাদের ২০২৫ সালের গড় স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৩৫৫ ডলারে পুনর্নির্ধারণ করেছে। ভাওদা মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমতে পারে, তবে তা অস্থায়ী হবে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে, তাই যে কোনো সময় দেশের বাজারেও দাম বাড়ানো হতে পারে বলে বাজুস সূত্রে জানা গেছে। সবশেষ গত ১৪ অক্টোবর রাতে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস ভরিতে ২ হাজার ৬১৩ টাকা বাড়িয়েছিল।
নতুন দাম অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকায়। এছাড়া ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৬ হাজার ৪৯৯ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ১ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণ ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৫১ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্লাটিনামের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭০৬ দশমিক ৬৫ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬০৬ ডলার হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের কেন্দন অনেক বেশি গুরুত্ব দিলেও বর্তমানে একক মুদ্রার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণের সংরক্ষণ বাড়িয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গ্লোবাল ইকোনমিতে যে ভোলাটিলিটি (অস্থিরতা) দেখা যাচ্ছে, তাতে অনেক দেশ বা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারী ডলার না রেখে ট্যানজিবল অ্যাসেট (ধরা-ছোঁয়া যায় এমন সম্পদ) রাখতে চাচ্ছে বলেই গোল্ডের ওপর চাপ বাড়ছে।’
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস এক পূর্বাভাসে বলেছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম চার হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে চার হাজার ২০০ ডলারের আশপাশে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, স্বর্ণের দামের সঙ্গে অনিশ্চয়তার একটা সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকিং সুদের হারের ওপরও এটি নির্ভর করে।
তিনি বলছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের অবস্থানের কারণে আগে বিভিন্ন দেশের কেন্দ ীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভের ক্ষেত্রে ডলারকে অনেক প্রাধান্য দিত, সবাই ডলারকেই নিরাপদ জায়গা হিসেবে মনে করত। কিন্তু ইদানীং বিভিন্ন পপুলার কারেন্সির বাইরে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে গোল্ডের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।’
স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘এগুলো এত ভোলাটাইল (অস্থির) যে এটা বলা কঠিন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং ডলারের সুদের হারের ওপর এগুলো অনেকটা নির্ভর করে।’
বাংলাদেশে স্বর্ণের বাড়তি দাম প্রসঙ্গে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যেসব দেশে স্বর্ণ উৎপাদন হয় এবং সরকারিভাবে আমদানির সুযোগ রয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে মিল থাকবে না এটা স্বাভাবিক।
তবে বাজারের ওপর কেবল ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এক্ষেত্রে স্বর্ণ চোরাচালানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post