দেলোয়ার কবীর, ঝিনাইদহ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পহেলা ফাল্গুন বাঙালির ভালোবাসা দিবসে ঝিনাইদহের মানুষ বেশ ভালোই ফুলের কদর করেছেন। প্রিয়জনদের উপহার দিয়েছেন আর ফুলচাষি-ব্যবসায়ীরাও বেশ ভালোই লাভ করছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও চাষিরা ভালো বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নিজে তো বটেই, অতিরিক্ত কৃষিশ্রমিক লাগিয়ে যাতে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো যায় সে জন্য তোড়জোড় শুরু করেছেন। ঝিনাইদহ সদরের গান্না বাজার এবং কোটচাঁদপুরের তালিনা বাজার হচ্ছে জেলার বড় দুটি ফলের বাজার। গান্না বাজারে ঝিনাইদহ সদর, কালীগঞ্জের আংশিক এবং পার্শ্ববর্তী যশোরের জেলার আংশিক এলাকা থেকে ফুলচাষিরা নিয়ে আসেন তাদের ফুল বিক্রি করতে।
কোটচাঁদপুর উপজেলার তালিনা গ্রামে গেলে চোখ ধাঁধিয়ে যায় সেখানকার পুলের মাঠ দেখে। চারদিকে শুধু ফুল আর ফুল যা থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তালিনার মাঠে মনে হয় প্রকৃতিতার সবুজ, লাল আর হলুদ রঙের বিছানা বিছিয়ে রেখেছে অনাগত অতিথিদের জন্য। শেষ শীতের সকালে সূর্য উঁকি মারার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো যেন ঠিকরে পড়ছে চোখেমুখে, সারা শরীরে।
কালীগঞ্জের তালিনার মতোই সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলা বিভিন্ন গ্রামেও দেখা মেলে একই চিত্রের। লাল, গোলাপি আর সাদা আবার গোলাপের পাশাপাশি কিছু কালো গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকা, বোতাম ফুল, রজনীগন্ধা আর চির পরিচিত গাঁদা ফুল তো আছেই। দৃষ্টিনন্দন লাইনে লাগানো এসব ফুলের সারি যেন শিল্পীর আঁকা কোনো শিল্পের অংশ। বেশ কয়েকটি ক্ষেতে দেখা গেল কৃষিশ্রমিকদের কীটনাশক স্প্রে করতে। পোকামাকড় যাতে ফুল বা গাছের ক্ষতি না করতে পারে সে জন্যই এই ব্যবস্থা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী আর পুরুষ কৃষিশ্রমিকরা তুলে যাচ্ছেন সব ধরনের ফুল, আবার তাদের কেউ কেউ তা বাছাই করে আঁটি বাঁধছেন পরিবহনে তুলে দেওয়ার জন্য।
গান্নার একটি গাঁদা ফুলের ক্ষেত থেকে তুলে ১৫-২০টি মালার ঝোপা বাঁধছিলেন বেশ কয়েকজন নারী শ্রমিক। তারা জানালেন, প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ফুল তুলে বা পরিচর্যা করে তারা দেড়শ থেকে ২০০ টাকা পান; যা তাদের সংসারে বড় ভূমিকা রাখে। ফুলচাষে কর্মরত শ্রমিকের বড় অংশই নারী বলে জানালেন তারা। তরুণ-তরুণীদের বসন্ত বা ভালোবাসা দিবসে গোলাপ, জারবেরা আর গ্লাডিওলাস পছন্দের শীর্ষে থাকলেও শহীদ দিবসে গাঁদা আর গোলাপের দিকে নজর দেন। ফুলচাষিরা জানালেন, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং পহেলা ফাল্গুন আরও এক কোটি টাকা অর্থাৎ এ পর্যন্ত আড়াই কোটি টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি তারা আরও প্রায় এক কোটি টাকার ফুল বিক্রি করবেন বলে মনে করছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতার কারণে তারা গত দেড় বছর কষ্টে থাকলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছেন। কেননা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার পক্ষের শক্তি এবার ক্ষমতাসীন। দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে বলে আশায় বুক বাঁধছেন। তাদের মতে, পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে সমন্বয়হীনতা ও আইনহীনতা থাকেলে ফুলের মতো স্পর্শকাতর কৃষিপণ্যেও ব্যবসা ঝুঁকি ও ক্ষতির মুখে পড়ে, চাষির মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।
ওইসব ফুলচাষির মতে, দেশ স্থিতিশীল থাকলে মানুষের মধ্যে ভরসাও ভ্রাতৃত্ববোধ জšে§, ফুল ও মিষ্টি বিনিময় ও বিতরণ বেশি হয়; যা দেশের জন্য আশীর্বাদ। আর দেশ খারাপ অবস্থার কবলে পড়লে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ফুলের বাজার অন্যতমÑবললেন ফুলচাষিরা।
গান্না বাজারে বেশ কয়েকজন ফুলচাষি বেশ আক্ষেপের সুরে বললেন, ফুলচাষ নিঃসন্দেহে একটি লাভজনক চাষ হলেও লাভের অঙ্ক চলে যায় পরিবহন আর খারাপ আবহাওয়ার পেটে। রাস্তাঘাটের দুরবস্থাকরণে পরিবহন ভাড়া বাড়ে এবং ফুলের মান কমে যায়। ফলে দামও পড়ে যায়। আর হিমাগারের সুবিধা থাকায় পচনশীল ফুল ২-১ দিনের মধ্যেই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে চাষিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন আর দেশ বঞ্চিত হয় রাজস্ব থেকে যা একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য হুমকি। তারা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঝিনাইদহে একটি ফুল সংরক্ষণের হিমাগার স্থাপনের জোর দাবি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা ডিএইর মতে, ঝিনইদহ সদর, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও সীমান্তবর্তী মহেশপুরে ফুলের বাণিজ্যিক আবাদ হলেও শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডুতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ হয় না। উল্লিখিত চার উপজেলায় ৫৮৯ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয় টাকার অঙ্কে; যা প্রায় পাঁচ কোটি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহ খামারবাড়ির উপপরিচালক মোহম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি জানালেন, সরকারিভাবে ফুল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ ও কুলিংভ্যানে ফুল পরিবহন ও ফুলের স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে যশোরের মতো ঝিনাইদহের ফুলও দেশের মানুষের চাহিদা যেমন মেটাতে পারত, তেমনি তা বিদেশে রপ্তানি করার পথও সহজতর হতো আর দেশ প্রচুর বৈদেশির মুদ্রা আয় করতে পারত। তিনি জানান, ফুল সংরক্ষণ, ফুলের চাষ নিরাপদ, সহজ ও লাভজনক করতে ফুলচাষিদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সার্বক্ষণিক দেখভালসহ সব রকম সহযোগিতা তাদের মাঠপর্যায়ের উপ-সহকারি কৃষি অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাব দিতে হবে বলে তিনি জানান।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post