শিক্ষা ডেস্ক: রাহাত (ছদ্মনাম) যখন ঢাকার একটি নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল, তার চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন। রঙিন ব্রোশিওর আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পাসের হাতছানি তাকে বুঝিয়েছিলÑ এটাই সফলতার রাজপথ। চার বছর পর হাতে যখন সার্টিফিকেটটা এলো, রাহাত তখন এক অদ্ভুত শূন্যতায়। যে ওবিই কারিকুলামের কথা তাকে শোনানো হয়েছিল, যে বিশ্বমানের শিক্ষার বুলি আউড়ানো হয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও কি সে পেয়েছে? না কি সে স্রেফ একটি বিশাল ব্যবসায়িক চক্রের ‘গ্রাহক’ মাত্র ছিল?
রাহাতের এই গল্প আজ এ দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল উচ্চশিক্ষার সংকট মেটাতে। কিন্তু তিন দশক পর এসে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছেÑ আমরা কি সত্যিই মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছি, না কি আমরা স্রেফ কিছু সনদ বিক্রির কারখানার জš§ দিয়েছি?
ওবিই কারিকুলাম: বাস্তব শিক্ষা না কি এআই-জেনারেটেড ‘শো-পিস’?
বর্তমান উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় ‘বুলি’ হলো আউটকাম বেজড এডুকেশন বা ওবিই। বলা হয়, এই পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী কী শিখল এবং কর্মজীবনে তা কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই মুখ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্রে ওবিই-র জয়জয়কার। কিন্তু ভেতরের খবর নিতে গেলে বেরিয়ে আসে অন্য এক দৃশ্য।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যায়, ওবিই কারিকুলামের বিশাল সব ফাইল তৈরি করা হয়েছে কেবল ইউজিসি বা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের পরিদর্শনের সময় দেখানোর জন্য। অভিযোগ আছে, এই কারিকুলামের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে অনেক ক্ষেত্রে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাও অনেক সময় জানেন না, এই জটিল গাণিতিক ছকগুলো আসলে ক্লাসরুমে কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছেÑ কাগজে-কলমে শতভাগ ওবিই মানা হলেও, বাস্তবে সেই পুরোনো আমলের ‘মুখস্থ কর আর খাতায় লেখ’ পদ্ধতিই চলছে। প্রশ্ন জাগে, এ দেশের কতজন শিক্ষক এই ওবিই কারিকুলাম পড়ানোর জন্য প্রকৃত অর্থে প্রশিক্ষিত? হাতেগোনা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাতেই শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নতুন কোনো পদ্ধতি শেখার বা তা নিয়ে গবেষণার সময় তাদের কোথায়? প্রশিক্ষণ বলতে বড়জোর কয়েক ঘণ্টার সেমিনার, যা দিয়ে সাগরের মতো গভীর এক শিক্ষাপদ্ধতি বোঝা অসম্ভব।
রাঙ্কিংয়ের ইঁদুর দৌড় ও নথিপত্রের কেরামতি: আজকাল পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়, অমুক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব রাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। কিন্তু এই রাঙ্কিংয়ের পেছনের গল্পটা সব সময় মধুর নয়। অভিযোগ আছে, আন্তর্জাতিক রাঙ্কিংয়ের নাম ওঠানোর জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ডেটা বা তথ্য নিয়ে কারসাজি করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত থেকে শুরু করে গবেষণার সংখ্যাÑ সবখানেই যেন একটু বাড়িয়ে বলার প্রবণতা।
এমনকি অনেক শিক্ষককে বাধ্য করা হয় কোনো নামহীন জার্নালে দায়সারা গবেষণা ছাপাতে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সাইটেশন সংখ্যা বাড়ে। এর সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। বিশ্ব রাঙ্কিংয়ের স্থান পাওয়ার নেশায় আমরা কি শিক্ষার আসল ভিত্তি, অর্থাৎ ক্লাসরুমের পাঠদানÑ ভুলে যাচ্ছি না?
অস্থায়ী অনুমোদন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: আরেকটি ভয়ংকর সমস্যা হলো ‘অস্থায়ী অনুমোদন’। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নতুন বিভাগ খুলছে কেবল বাজারের চাহিদা দেখে। কিন্তু সেই বিভাগের কারিকুলাম ইউজিসি থেকে স্থায়ীভাবে অনুমোদিত হওয়ার আগেই কয়েক ব্যাচ শিক্ষার্থী পাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। পরে যখন আইনি জটিলতা তৈরি হয়, তখন বলিরপাঁঠা হয় শিক্ষার্থীরা। বছরের পর বছর অস্থায়ী কারিকুলামে শিক্ষাকার্যক্রম চালানো কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি হাজার হাজার তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।
অবকাঠামোর নামে কেবল এসি রুম: বাইরে থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দারুণ ঝকঝকে মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দৈন্য দশা প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা ল্যাবে কাজ না করে কেবল ইউটিউব ভিডিও দেখে শিখছেÑ এমন নজিরও কম নয়।
ক্যান্টিনের অবস্থা তো আরও করুণ। অতিরিক্ত দামে নিম্নমানের খাবার খাওয়া যেন শিক্ষার্থীদের নিয়তি। আর লাইব্রেরি? অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরি কেবল বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহƒত হয়, যেখানে হালনাগাদ বই বা আন্তর্জাতিক জার্নালের অ্যাক্সেস নেই বললেই চলে। অথচ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি সেমিস্টারে বড় অংকের লাইব্রেরি ও ল্যাব ফি নেওয়া হচ্ছে নিয়মিত।
নেপথ্যের অন্যান্য সংকট: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে শিক্ষকদের কোনো নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। আজ চাকরি আছে তো কাল নেই। এই অনিশ্চয়তা নিয়ে একজন শিক্ষক কীভাবে মানসম্পন্ন পাঠদান করবেন? এ ছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা শিক্ষা কার্যক্রমে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ করেন। নিয়োগ থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনাÑ সবই চলে ব্যবসায়িক স্বার্থে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনীতির ছায়া। ছাত্র রাজনীতি সরাসরি না থাকলেও প্রশাসনিক পর্যায়ে দলাদলি আর প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের দাপট অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রশাসনের দায়: একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না। এখানে প্রত্যেকেরই কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে।
ইউজিসি ও বিএসির প্রতি: ইউজিসি এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে কেবল ‘পরিদর্শক’ হিসেবে কাজ করলে চলবে না। পরিদর্শনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে তথ্য দিচ্ছে, তা মাঠপর্যায়ে ক্রস-চেক করতে হবে। ওবিই কারিকুলাম কেবল কাগজে আছে না কি ক্লাসরুমে প্রয়োগ হচ্ছে, তা যাচাই করতে সারপ্রাইজ ভিজিট বা সরাসরি শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অস্থায়ী অনুমোদনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করতে হবে এবং শর্ত পূরণ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি: বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শপিং মল নয়। আপনারা শিক্ষা বিক্রি করছেন না, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ছেন। শিক্ষকদের বেতন ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, যাতে তারা পড়ানোয় মনোযোগী হতে পারেন। ওবিই-র নামে এআই দিয়ে বানানো ডকুমেন্ট বন্ধ করে শিক্ষকদের নিয়মিত ও মানসম্মত দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। ট্রাস্টি বোর্ডকে মনে রাখতে হবে, মুনাফা নয়, মানই হওয়া উচিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সম্পদ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের দেশের বোঝা নয়, সম্ভাবনা। কিন্তু সেই সম্ভাবনা আজ মুনাফালোভী মানসিকতা আর প্রশাসনিক গাফিলতির চাপে পিষ্ট। আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা কেবল একটা কাগজের সার্টিফিকেট নিয়ে বেকারত্বের মিছিলে নাম লেখাক। আমরা চাই তারা দক্ষ মানবসম্পদ হয়ে গড়ে উঠুক।
রাহাতের মতো আর কোনো শিক্ষার্থী যেন চার বছর পর ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে না বলে, ‘আমি কি সত্যিই কিছু শিখলাম?’ এই প্রশ্নটিই হোক আমাদের উচ্চশিক্ষার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। শিক্ষা হোক অধিকার, ব্যবসা নয়।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post