ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের ঘাটে এখন আর সেই পুরোনো কোলাহল নেই। শীতলক্ষ্যার তীরে একসময় সারি সারি বস্তাবন্দি পাট, ট্রাকের হর্ন, শ্রমিকদের হাঁকডাকÑ সব মিলিয়ে যে বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে এখন অস্বস্তিকর নীরবতা। কারণ একটাইÑ ব্যাংক ঋণপত্র বা এলসির মাধ্যমে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ। এই এক সিদ্ধান্তে থমকে গেছে বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক চক্র। বিপাকে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের শত শত পাট ব্যবসায়ী, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্রাম-বাংলার কৃষকের ওপর।
সরকার টিটির মাধ্যমে সীমিত আকারে পাট রপ্তানির অনুমতি দিলেও এলসির মাধ্যমে রপ্তানি কার্যত বন্ধ। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রচলিত পদ্ধতি। ফলে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয় আদেশ দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ভারত, ব্রাজিল, নেপাল, মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, ভিয়েতনাম ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়। বর্তমানে এসব দেশেই বাংলাদেশের পাটের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এলসি বন্ধ থাকায় ৩৪ হাজার ৫০০ টন পাটের ক্রয়াদেশ ঝুলে আছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অবস্থায় বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের জায়গা দ্রুত দখলে নিচ্ছে ভারত। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া পাট ভারত হয়ে অন্য দেশে যাচ্ছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা হারানোর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ)-এর চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, টিটির মাধ্যমে ৬ হাজার তিনশ ৭৭ টন এক্সপোর্টের অনুমোদন দিয়েছে। এলসির মালটি রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রপ্তানি না হলে ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল পাট পড়ে থাকবে। ফলে ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে থাকবে। এতে আগামী মৌসুমে পাট কম কিনবেন তারা। তিনি বলেন, এ বছর সার ও তেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আগামী মৌসুমে কৃষকরা উৎপাদন খরচ উঠাতে পারবে না। আর এমনটা হলে, তারা পাট চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। তাই সবার স্বার্থে এখন পাট রপ্তানি পুরোপুরি খুলে দেওয়া দরকার।
নারায়ণগঞ্জের সাদাত জুট এক্সচেঞ্জের মালিক দেলওয়ার হোসেন জানান, ২০২৪-২০২৫ সালে সারা দেশে ৭০ লাখ বেল বা দুই কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার মণ পাট উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় এর মূল্য ছিল মণপ্রতি ৫ হাজার টাকার নিচে। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রপ্তানির ঘোষণা দেয়। সরকারের ঘোষণার পরে যার যার কাছে পাট রপ্তানির জন্য টিটি ও এলসি ছিল বিদেশি ক্রেতারা সেগুলোর সময় বাড়িয়ে দেয়। রপ্তানির ঘোষণার খবরে পাটের মূল্য বেড়ে যায়। তোষা পাট ৫৮০০ টাকার আশপাশে, মেস্তা ৫৫০০ থেকে ৫৬০০ টাকা, সুতি পাট ৫০০০ থেকে ৫১০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু পরে জানা যায়, এলসির মাধ্যমে পাট রপ্তানি বন্ধ। ফলে পাটের দাম আবার কমতে থাকে। বর্তমানে তোষা পাট মণে প্রায় ৭০০ টাকা কমে ৫১০০ টাকায়, মেস্তা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কমে ৪৬০০ থেকে ৪৭০০ টাকা, সুতি পাট ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা কমে ৪২০০ থেকে ৪৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অথচ বর্তমান সময়ে ভারতের কৃষকরা পাট বিক্রি করছে কমবেশি ৯০০০ টাকা মণ দরে।
নারায়ণগঞ্জের সাদাত জুট এক্সচেঞ্জের হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যায়। সরকার রপ্তানির ঘোষণা দিলে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল। সব ধরনের পাটের দাম বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এলসি বন্ধ থাকার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবার দরপতন শুরু হয়।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা আশঙ্কা করছেন, ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল পাট অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। এর মানে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা বাজারে অচল হয়ে পড়বে। নারায়ণগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী বলছেন, ‘আমরা যদি পাট বিক্রি করতে না পারি, তাহলে আগামী মৌসুমে কম পাট কিনব। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষক।’
ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাট এসে জমা হয় নারায়ণগঞ্জের আড়তে। এই সরবরাহ চেইনের প্রথম ধাপেই এখন চাপ তৈরি হয়েছে। কৃষক মোস্তফা মিয়ার কথায় উঠে আসে বাস্তবতাÑ এবার পাট চাষ করতে গিয়ে সবকিছুর দাম বেশি। ড্যাপ সার ১০৫০ টাকার জায়গায় ১৪০০-১৫০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। পেট্রোল ২০০ টাকা লিটার দরে কিনেছি। কিন্তু পাট বিক্রি করতে গিয়ে সেই দাম পাই না। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বিক্রয়মূল্য কমেছেÑ এই দ্বৈত চাপে কৃষক কার্যত ক্ষতির মুখে।প্রথম পৃষ্ঠার পর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রপ্তানি বন্ধ থাকলে বাজার কখনো থেমে থাকে নাÑ পথ বদলায়। ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাট পাচারের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে পাট কম দামে কিনে ভারত হয়ে আবার অন্য দেশে যাচ্ছে। এতে লাভ করছে অন্যরা, আমরা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, নীতিগত ব্যর্থতারও ইঙ্গিত বহন করে।
সরকার টিটির মাধ্যমে সীমিত রপ্তানির অনুমতি দিয়ে এক ধরনের ‘আংশিক মুক্তি’ দিয়েছে। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এলসি ছাড়া বড় পরিমাণে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে টিটির মাধ্যমে সীমিত রপ্তানি কার্যত প্রতীকী হয়ে আছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে কৃষকের আগ্রহ হারানো।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post