নিজস্ব প্রতিবেদক : জনপ্রশাসন সংস্কার ও সরকারি সেবায় কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া নতুন পে-স্কেল ঘুস ও দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
একইসঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ যৌক্তিক হলেও এর অতিরিক্ত বোঝা বইবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে ভারাক্রান্ত জনগণের ওপর। প্রস্তাব অনুযায়ী যে বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দরকার, তা অর্জনের জন্য অর্থসংস্থানসহ আনুষঙ্গিক কোনো সুযোগ-সুবিধা সরকার তৈরি করতে পারেনি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় এই ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা অর্জনের উপযুক্ত পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়নি। সর্বোপরি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দ্রব্যমূল্যসহ সব খাতের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জনগণের জীবনযাপনের যে ব্যয় বাড়বে, সে বিষয়টি সরকার ভেবে দেখেছে কি না? এ ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা যদি থেকেও থাকে, তাহলে সেটাই বা কী? কোনো উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব হবে? তা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।
জনগণের করের টাকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হলেও ঘুস, দুর্নীতি এবং অনিয়মও যেন একটি বড় সংখ্যক কর্মচারীদের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে সরকারি খাতে দুর্নীতি কমে, বরং যে হারে বেতন বৃদ্ধি ঘটে তার চেয়ে বেশি হারে ঘুসসহ অবৈধ লেনদেন বাড়ে, যার বোঝা জনগণকে বইতে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবেÑএমন ভাবার কোনো কারণ নেই। একদিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সেবা প্রদানের মানসিকতার ঘাটতি, জবাবদিহিহীন আচরণ ও লাগামছাড়া দুর্নীতিতে অভ্যস্ত রাখা, অন্যদিকে সংকীর্ণ স্বার্থে তাদের চাহিদামাফিক বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আবদার মেটানো সাধারণ জনগণের প্রতি উপহাসের শামিল।
তিনি বলেন, জনগণের ওপর অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় অর্থের বোঝা না চাপিয়ে যদি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য উপায় সরকার বের করতে পারে, সে ক্ষেত্রেও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সব পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট আইনকানুন ও বিধি প্রতিপালন বাধ্যতামূলক করা সাপেক্ষে এবারের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনা করলে জনগণ হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে হলেও আরও একবারের জন্য মেনে নিতে পারে। যার অন্যতম পূর্বশর্ত হবে, সব পর্যায়ের সব কর্মচারীর আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ করা ও তা প্রকাশ করা। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানাই।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে চলতি মাসেই নতুন পে-স্কেল চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। এজন্য চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অতিরিক্ত প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এই খাতের মোট বরাদ্দকে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসের জানুয়ারি থেকে অন্তত মূল বেতন অথবা ভাতার একটি অংশ কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এমনকি প্রজ্ঞাপন জারিতে দেরি হলেও তা বকেয়া হিসেবে (এরিয়ার) দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে সংশোধিত বাজেটে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক ভিত্তি প্রস্তুত করে রাখল, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করতে পারে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, মূল বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। উন্নয়ন খাতের এই ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করে মূলত সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় মেটানো হবে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত পে-কমিশন তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, ‘কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বর্তমানে ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন পান। তবে সামরিক বাহিনী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ প্রায় ২৪ লাখ মানুষ এই নতুন পে-স্কেলের সরাসরি সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছেন।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ উপদেষ্টা। এজন্য নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন আপাতত প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, একজন উপদেষ্টা বৈঠকে বলেছেন দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিবেচনা করলে শুধু সরকারি চাকরিজীবীর বেতন অনেক বেশি বাড়ানো বৈষম্যমূলক হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধ আয়ের কথা উল্লেখ করে সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।
এই প্রস্তাবে আরও দুই উপদেষ্টা ঐকমত্য পোষণ করেন। একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বৈঠকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেন নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর না করে, সেজন্য বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। বেতন কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াইগুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় বেতন কমিশনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনার পর এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠনের কথা ছিল, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু উপদেষ্টাদের অসন্তুষ্টির কারণে সেই কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে এই সরকারের আমলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ সরকারের আমলে বেতন বাড়ার সুপারিশ বাস্তবায়িত না হলে ধারাবাহিকতা অনুযায়ী নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী দেখার পর আন্তঃমন্ত্রণালয়ে এ কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে। এরপর মন্ত্রিপরিষদে যাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। নির্বাচিত সরকার এ প্রস্তাব পরিবর্তনও করতে পারে।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। কমিটি হলে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। বেতনের বাড়তি অর্থের জোগান কীভাবে হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা না বলে চলে যান।
জানা যায়, বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বাড়তি দরকার পড়বে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রায় একই হারে পেনশন, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ভাতাও বাড়বে।
বৈঠক সূত্রে আরও জানা যায়, দুইজন উপদেষ্টা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পার্থক্য বেশি হওয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, বিদ্যমান বেতন কাঠামোয় মূলত কর্মচারীদের জীবন যাপনে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বেতন কমিশন আগের মতোই কর্মচারীদের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।
নতুন নিয়মে দশম গ্রেডে বেতন ৩২ হাজার টাকা। এরপর নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। এতে বেতনের পার্থক্য ১৩ হাজার টাকা। অথচ ২০ গ্রেড থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত বেতনের পার্থক্য ৫ হাজার টাকা। আবার ২০, ১৯ ও ১৮ গ্রেডে বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫০০ টাকা। গত বুধবার বেতন কমিশনের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার পর থেকে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে এনিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী বলেছেন, পে স্কেলের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের মূল দাবি প্রতিফলিত হয়নি। তাদের মূল দাবি ছিল ১:৪ অনুপাতে গ্রেড পুনর্গঠন করে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ, কিন্তু কমিশনের প্রস্তাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post