নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি: আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বিনিয়োগ বাড়ানো, কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাজারের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজিবাজারকে আরও লাভজনক ও আস্থাশীল করে তুলতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজার ঘিরে একটি বিশেষ কাঠামো থাকতে পারে। সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংক খাতে শিল্প খাতের ঋণনির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে যারা শিল্পায়নে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
এদিকে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১৮০ দিনের কর্মসূচি এবং নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, কর্মপরিকল্পনার আওতায় বাজার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার, বিনিয়োগকারীদের শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছে কমিশন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও পুঁজিবাজার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কমিশন ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
এর আগে গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আগামী বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে পদক্ষেপ থাকবে বলে জানিয়েছিলেন।
বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও সঠিকভাবে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছিলেন, ‘তাদের কাজে যদি ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। পুঁজিবাজার যেন সাধারণ মানুষের বাজারে পরিণত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আমরা আগামী বাজেটে হাজির করব।’
গত ১২ মে বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির উদ্বোধনী ফান্ড ঘোষণা অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ বাজার ও আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে।
আর্থিক খাতকে তার নিজস্ব গতিতে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার, বিনিয়োগ বাজার ও আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজারে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ বছর ধরে নানামুখী সংকটে জরাজীর্ণ দেশের পুঁজিবাজার। সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। সুশাসনের অভাব, প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকা এবং অনিয়ম ও কারসাজিকারীদের যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনাÑএসব কারণে তৈরি হয়েছে এই সংকট। পাশাপাশি নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্ত না হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা এবং ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা যোগ করেছে নতুন মাত্রা। দেশের আর্থিক খাতে অনিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতায় পুঁজিবাজারেও বড় বড় অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সালে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যৌথভাবে কারসাজিতে জড়িত হয়ে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করেছেন। বিভিন্ন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে তছরুপের ঘটনাও ঘটেছে। ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে লুটপাট করা হয়েছে। আর এসব ঘটেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাকের ডগায়।
বিনিয়োগকারীদের একাংশের মতে, নির্বাচিত সরকার এলে দেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি ক্ষমতা আসার পর বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়। ইতোমধ্যে বিএনপি সরকার পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যাপক সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বোর্ডে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তি নিয়োগ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের অঙ্গীকার করেছে। আসন্ন বাজেটেও পুঁজিবাজার নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, আসন্ন বাজেটে শেয়ারবাজারকে ঘিরে আলাদা কিছু উদ্যোগও সামনে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট সবাই বাজেটে এ খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনার প্রত্যাশা করছেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যাংক ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এই সরকার দায়ী নয়; এসব ঘটেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। লুট হওয়া অর্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। বর্তমানে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি বীমা ও লিজিং খাতেও সংকট চলছে। এরই মধ্যে পাঁচটি লিজিং কোম্পানি বন্ধে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজেটে শেয়ারবাজারের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে না। বাজারের স্বার্থে অতিরিক্ত করের চাপ এড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটসের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সিকিউরিটিজ মার্কেটকে ব্যবহার করা উচিত। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এ প্রস্তাব দিয়ে আসছেন এবং এবারও একই সুপারিশ করছেন। তার মতে, সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয় এবং ব্যাংক খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এর পরিবর্তে সরকার যদি সিকিউরিটিজ মার্কেটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে, তাহলে পুঁজিবাজার আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বন্ড ও সিকিউরিটিজ সাধারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ফলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং বাজারও শক্তিশালী হবে। এতে সরকার ও বিনিয়োগকারী-উভয় পক্ষই উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি দাবি করেন, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ে যে বাজেট পাস হয়েছিল, সেখানে বাস্তবভিত্তিক কোনো উদ্যোগ ছিল না। তাদের কার্যক্রম মূলত কমিশন পরিবর্তন ও বিভিন্ন সংস্কারমূলক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাজারের প্রকৃত উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্য, শুধু সংস্কার বা প্রতিবেদন জমা দিলেই হবে না; বাজারের বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা এখনো হতাশার মধ্যে রয়েছেন এবং এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post