বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে দীর্ঘদিন ধরে টানা মূল্যবৃদ্ধির পর অবশেষে বড় ধরনের স্বস্তির খবর এসেছে। কয়েক দফা লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের বাজারে হঠাৎ করেই কমেছে সোনার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ঘোষণা দিয়েছে যে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম কমানো হয়েছে ৯ হাজার ২১৪ টাকা।
নতুন এই মূল্য তালিকা ৬ মার্চ ২০২৬ থেকে সারাদেশে কার্যকর হয়েছে। নতুন ঘোষণার ফলে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়িয়েছে -প্রতি ভরি ২ লাখ ৬৮ হাজার ২১৪ টাকা।
এই মূল্যহ্রাস দেশের স্বর্ণপ্রেমী ও গহনা ক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিয়ে ও উৎসব মৌসুম সামনে থাকায় অনেক ক্রেতা নতুন করে বাজারমুখী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন মূল্য তালিকায় বিভিন্ন ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করেছে। নিচে সর্বশেষ ঘোষিত দামগুলো তুলে ধরা হলো—
২২ ক্যারেট স্বর্ণ (প্রতি ভরি): ২,৬৮,২১৪ টাকা
২১ ক্যারেট স্বর্ণ (প্রতি ভরি): ২,৫৬,০২৫ টাকা
১৮ ক্যারেট স্বর্ণ (প্রতি ভরি): ২,১৯,৪৫৮ টাকা
সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ (প্রতি ভরি): ১,৭৯,১৫৯ টাকা
এই দাম শুধুমাত্র স্বর্ণের মূল্যের ওপর নির্ধারিত। গহনা তৈরির ক্ষেত্রে এর সঙ্গে মেকিং চার্জ ও ভ্যাট যোগ হওয়ায় বাস্তবে গহনার দাম আরও কিছুটা বেশি হতে পারে।
স্বর্ণের দাম কমানোর পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। বাজুসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মূলত দুটি বিষয় এই মূল্যহ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছে।
দেশীয় বাজারে তেজাবি বা বিশুদ্ধ স্বর্ণের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে স্বর্ণের চাপ কিছুটা কমেছে। যখন সরবরাহ বাড়ে এবং চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম কমার প্রবণতা দেখা যায়।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ওঠানামা বাংলাদেশের বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমায় দেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এই দুটি কারণ মিলিয়ে বাজুস সোনার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
দেশের স্বর্ণবাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা দাম বাড়ছিল। অনেক ক্রেতা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন কারণ স্বর্ণের দাম ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, **৩ মার্চ ২০২৬** তারিখেও এক দফায় সোনার দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেদিন প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম **৩ হাজার ৩২৪ টাকা** বৃদ্ধি পেয়েছিল।
কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে বড় ধরনের সমন্বয় করে বাজুস নতুন করে দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। ফলে আগের উচ্চমূল্য থেকে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরেছে।
স্বর্ণের দাম কমার খবরে সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। বিশেষ করে যারা বিয়ের গহনা বা বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন, তারা এখন কিছুটা কম দামে স্বর্ণ কিনতে পারবেন।
বাংলাদেশে স্বর্ণ শুধু অলংকার হিসেবেই নয়, বরং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবেও বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় অনেক মানুষ স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন।
দাম কমার ফলে—
* নতুন ক্রেতারা বাজারে আগ্রহী হতে পারেন
* জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের বিক্রি বাড়তে পারে
* বিয়ের মৌসুমে গহনার বাজার কিছুটা চাঙ্গা হতে পারে
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী—
* **মোট ৩৭ বার স্বর্ণের দাম পরিবর্তন হয়েছে**
* এর মধ্যে **২৪ বার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে**
* আর **১৩ বার দাম কমানো হয়েছে**
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, বাজারে স্বর্ণের দাম অত্যন্ত অস্থির অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, ডলার রেট, এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।
শুধু ২০২৬ সাল নয়, গত বছরও স্বর্ণের বাজার ছিল অত্যন্ত অস্থির।
২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
এর মধ্যে— ৬৪ বার দাম বেড়েছিল, বাকি সময় দাম কমানো হয়েছিল
এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে গত কয়েক বছর ধরে স্বর্ণের বাজার ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে।
স্বর্ণ কেনার সময় ক্রেতাদের কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত।
সবসময় হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ কেনা উচিত। এতে স্বর্ণের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
গহনার ক্ষেত্রে মেকিং চার্জ আলাদা হয়। দোকানভেদে এই চার্জ ভিন্ন হতে পারে।
স্বর্ণ কেনার আগে বাজুসের সর্বশেষ দাম দেখে নেওয়া ভালো। এতে অতিরিক্ত দাম দেওয়ার ঝুঁকি কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতেও ওঠানামা করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রবণতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম।
যদি আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আবার বাড়তে শুরু করে, তাহলে দেশের বাজারেও নতুন করে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমানে দাম কমার ফলে বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ফিরে এসেছে।
৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে ঘোষিত নতুন মূল্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বাজারে **২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ৬৮ হাজার ২১৪ টাকা** নির্ধারণ করা হয়েছে। টানা মূল্যবৃদ্ধির পর এই বড় ধরনের দাম কমানো সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর।
স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের কারণে এই মূল্যহ্রাস ঘটেছে। ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী আবারও স্বর্ণের দাম পরিবর্তিত হতে পারে।
স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা থাকলে নিয়মিত বাজারদর যাচাই করা এবং বিশ্বস্ত জুয়েলারি দোকান থেকে হলমার্কযুক্ত স্বর্ণ কেনাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post