সৌন্দর্যপিপাসুদের নতুন গন্তব্য
শার্শার পানবাড়িয়া
শাহারুল ইসলাম, বেনাপোল (যশোর)
শরৎ ঘিরে প্রকৃতি যেন নতুন গল্প লিখতে শুরু করে। শার্শা উপজেলায় সেই গল্পের সবচেয়ে চোখে পড়া চরিত্র এখন কাশফুল। সাদা তুলার মতো এই ফুল দুলে ওঠে বাতাসের দোলায়, মনে হয় যেন আকাশের মেঘ নেমে এসেছে ধুলোমাখা গ্রামবাংলার রাস্তায়। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের কাছে তাই শার্শা এখন সৌন্দর্যের এক নতুন গন্তব্য। যশোরের নগর বা বেনাপোল সীমান্তের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে থাকা এই কাশবনগুলোয় প্রতিদিনই আসছেন ভ্রমণপ্রেমী, ফটোগ্রাফার ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা।
শার্শার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাশফুলের স্পট হলো পানবাড়িয়া। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কাশফুলের মাথায় পড়া সোনালি রোদে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য। এই জায়গাটি এখন হয়ে উঠেছে বিবাহ-পূর্ব ফটোশুটের (প্রি-ওয়েডিং) প্রিয় লোকেশন। সাজপোশাক, ফটোগ্রাফি টিমÑসব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় সিনেমার মতো পরিবেশ। তরুণদের আড্ডা, পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা, কিংবা মনটা একটু হালকা করতে সবার জন্যই পানবাড়িয়া এক অপরূপ ঠিকানা।
সাতমাইলে রয়েছে নদী আর কাঁশফুলের শান্ত-নির্জন সহাবস্থান। নদীর নীল জলের পাড় ঘেঁষে বেড়ে ওঠা কাঁশবন যেন প্রকৃতির দুই বিপরীত আবহকে একই রঙে বেঁধে রেখেছে। এখানে বসে দূরের সাদা ঢেউ দেখলে কবিতার লাইনে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করবে। বিশেষ করে বিকালবেলায় আকাশের লাল আলো আর কাশফুলের শুভ্রতা মিলেমিশে এক মনভোলানো পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা ছবি ও ভিডিওগ্রাফির জন্য আদর্শ। অনেকেই সপ্তাহান্তে এখানে এসে ছোটখাটো পিকনিকের আয়োজনও করেন।
শান্ত প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ দেখতে চাইলে রুদ্রপুর হবে আরেক সেরা জায়গা। পানবাড়িয়া বা সাতমাইলের মতো এখানে খুব বেশি ভিড় হয় না, তাই যারা নিরিবিলি সময় কাটাতে চান, তাদের কাছে রুদ্রপুর যেন এক রহস্যময় স্বর্গ। বাতাসে একসঙ্গে দুলতে থাকা কাশফুলের সারি দেখে মনে পড়ে যায় সিনেমার রোমান্টিক দৃশ্য, কিংবা কোনো কবির নিঃশব্দ কাব্যচর্চা। পাখির ডাক, হালকা রোদের ছটা সব মিলিয়ে মন মুহূর্তেই হারিয়ে যায় অনন্ত প্রশান্তিতে।
কাশফুলের এই সৌন্দর্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আরও ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিদিন শত শত ছবি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। এতে করে স্থানীয় পর্যটনের একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পর্যটনের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃতি রক্ষাতেও সচেতনতা জরুরি। ফুল না ছেঁড়া, ঝোপের ভেতরে প্রবেশ না করা এবং আবর্জনা না ফেলার দিকে খেয়ার রাখতে হবে। কারণ এই কাঁশবন শুধু সৌন্দর্যের সম্পদ নয়; এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতিকে যত ভালোবাসা যাবে, সে তত নিঃস্বার্থভাবে সৌন্দর্য বিলিয়ে দেবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শার্শা উপজেলার পানবাড়িয়া, সাতমাইল ও রুদ্রপুর এখন শরতের এক অন্যতম আকর্ষণ। এখানে এলে মনে হবে, মানুষ যেন শহরের বাস্তবতা থেকে একটু দূরে এসে স্বপ্নের মধ্যে হাঁটছে। শুভ্র কাঁশফুলের অরণ্যে দাঁড়ালে চোখ, মন, আর ক্যামেরা, সবই ভরে যায় সাদা আনন্দে। শরৎকাল হয়তো খুব বেশি দিন থাকে না, কিন্তু এই কাশফুলের স্মৃতি থেকে যায় সারা বছর, মনকে বারবার টানে সেই সাদা শিহরনে ভরা শার্শার পথে।
পানবাড়িয়া গ্রামের ফটোগ্রাফার খোকন আহমেদ বলেন, শরতের প্রথম দিকে এখানে ক্যামেরা নিয়ে এসে দাঁড়ালে মনে হয় সময় থেমে গেছে, কাশফুলের ঢেউ আর হালকা হাওয়ায় প্রতিটি ছবিই জীবন্ত হয়ে ওঠে। সাতমাইল এলাকার তরুণ ভ্রমণপ্রেমী আবুল কালাম আজাদ বলেন, নদীর ধারে কাশফুলেরয়া ছবির মতো দৃশ্য পাচ্ছি, নিজেকে বারবার ফিরে দেখতে ইচ্ছা করে।
রুদ্রপুর গ্রামের গৃহবধূ ও ‘প্রকৃতিপ্রেমী’ সাবিনা আক্তার বলেন, ভিড় এড়িয়ে শুদ্ধ প্রকৃতিতে সময় কাটাতে আসি এখানে। কাশফুলের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় একান্ত পেছনে ফিরে এসে শান্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাজী নাজিব হাসান বলেন, শার্শার চর, বিল ও নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে কাশফুলের সুন্দর দৃশ্য লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post