নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : পুঁজিবাজারে ট্যানারি খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন সুজ লিমিটেড গত হিসাববছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শেয়ারপ্রতি মুনাফা থেকে লোকসানে চলে গেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্র জানায়, রোববার এ প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশ করা হয়। এর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকে ফরচুন সুজের শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ০.৩১ টাকা। আগের হিসাববছরের একই সময়ে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ০.১১ টাকা মুনাফা অর্জন করেছিল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা থেকে লোকসানের অবস্থায় নেমে এসেছে।
এদিকে আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফপিএস) হয়েছে ০.২৯ টাকা; যা আগের হিসাববছরের একই সময়ে ছিল ঋণাত্মক ০.১০ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৪.৩৯ টাকা।
২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফরচুন সুজের অনুমোদিত মূলধন ২৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৭০ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ৮২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ১৭ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ২৬৩। এর ৩০ দশমিক ৯৩ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৬ দশমিক ৪৯ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫২ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
২০২২-২৩ হিসাববছরে উদ্যোক্তা পরিচালক বাদে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাববছরে ফরচুন সুজের ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৫ পয়সা, আগের হিসাববছরে যা ছিল ২ টাকা ৩০ পয়সা। ৩০ জুন ২০২৩ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৫৬ পয়সায়।
২০২১-২২ হিসাববছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে ১০ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ। আলোচ্য হিসাববছরে ফরচুন সুজের ইপিএস হয়েছে ২ টাকা ৩০ পয়সা, আগের হিসাববছরে যা ছিল ১ টাকা ৫৯ পয়সা। ৩০ জুন ২০২২ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৩০ পয়সায়।
ফরচুন সুজের সর্বশেষ ঋণমান দীর্ঘমেয়াদে ‘বিবিবি প্লাস’ ও স্বল্পমেয়াদে ‘এসটি-৪’। ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৪ হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং রেটিং ঘোষণার দিন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক অন্যান্য পরিমাণগত ও গুণগত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রত্যয়ন করেছে ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস পিএলসি (সিআরআইএসএল)। ২০২৩-২৪ হিসাববছরে ফরচুন সুজের ঋণের পরিমাণ ৪৫ কোটি টাকা।
জেড ক্যাটেগরির এই কোম্পানিটি ভারত, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, কানাডা ও তাইওয়ানে তাদের পণ্য রপ্তানি করে থাকে। পাশাপাশি বরিশাল অঞ্চলের অবহেলিত নারী ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৪ মার্চ বরিশাল শিল্পনগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফরচুন সুজ লিমিটেড’। মাত্র ৪৭২ জন জনবল নিয়ে জুতা তৈরির কারখানাটি চালু হয় ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। ২০১২ সালের ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর দক্ষ শ্রমিকের অভাব থাকলেও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য পশ্চিমা দেশগুলোয় বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় সম্পূর্ণ রপ্তানিনির্ভর এ প্রতিষ্ঠান ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়।
ব্যবসা বাড়ার মধ্যে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ২০২১ সালে আরও চারটি (প্রিমিয়ার ফুটওয়্যার লি., এমজে ইন্ডাস্ট্রিজ, ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার অ্যান্ড টেকনোলজি লি. ও ফেন-এন ফুটওয়্যার লি.) প্রোডাকশন লাইন সংযুক্ত করে মোট ছয়টি লাইন করার পরিকল্পনা নেয় কোম্পানিটি।
স্পেন, জার্মানি, ভারত, ইতালি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় ফরচুনের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করায় একদিকে যেমন দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, অন্যদিকে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বরিশাল অঞ্চলের অবহেলিত নারীরা। এখানে কর্মরত সাড়ে চার হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী।
ফরচুন সুজ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. নাজমুল হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্ডার কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে; যার কারণে আগের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে। ভারতের বাজারে আগে আমাদের পণ্যের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল এবং সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্ডার আসত। তবে সরকার পতনের পর দেশের সামগ্রিক অস্থিরতার প্রভাবে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কার্যক্রম ব্যাহত হয়; যার কারণে অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব সরাসরি কোম্পানির আর্থিক অবস্থায় পড়েছে এবং লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় সক্রিয় হলে কোম্পানি ধীরে ধীরে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post