নুসরাত জাহান : পুরুষ ও নারী একই রথের দুটি চাকা। নারী যদি হয় সূর্যের তীর্যক কিরণ তবে পুরুষ সেই কিরণ দ্বারা আলোকিত করে সমগ্র পৃথিবী। তবে নারীর লড়াইয়ে পুরুষ অস্ত্র হলেও পুরুষের লড়াইয়ে নারী তার কবজ কি আদৌ হতে পারে? আমাদের সমাজ এক বিশাল ভবন। ভেতরের দেয়ালগুলো শক্ত, অটল, কিন্তু বাইরে থেকে অদৃশ্য। নারীর কণ্ঠস্বর এই দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাইরে আসে, শুনতে পায় সবাই। আর পুরুষ? তিনি অনেক সময় সেই অদৃশ্য দেয়ালের ভেতরে বন্দি, নিজের কষ্ট, ব্যথা আর নির্যাতন গোপনে বহন করে। কেউ দেখে না, কেউ শোনে না, তবুও প্রতিদিন এই অদৃশ্য দেয়ালের ভেতরে তিনি অমীমাংসিত যন্ত্রণা সহ্য করে।
সাধারণত সমাজে পুরুষদের প্রতি একটি অযৌক্তিক প্রত্যাশা থাকে তারা সবসময় শক্ত, সবসময় নির্ভীক, সবসময় সমস্যার সমাধান জানে। কিন্তু বাস্তবে, পুরুষরাও নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মানসিক চাপের সম্মুখীন হন। আর এই চাপ প্রকাশ করার সুযোগ খুব কম। যখন নারীরা আবেগের মাধ্যমে নিজের ব্যথা প্রকাশ করে, তখন পুরুষরা নীরবে সেই সব সহ্য করে। পরিবারে, কর্মস্থলে, সম্পর্কের ভেতরে পুরুষদের প্রতি ভয়, চাপ এবং অযৌক্তিক প্রত্যাশা সমাজের অনেক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে।
পুরুষদের মানসিক চাপ প্রায়ই অদৃশ্য থাকে। কেউ তাদের বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে না। ‘পুরুষের কান্না নেই’ এই ভুল ধারণা তাদের চাপে ঠেলে দেয়। কর্মস্থলে, সমাজে কিংবা ঘরের ভেতরে পুরুষদের প্রতি এমন চাপ থাকে যেন তারা সবসময় সফল, সবসময় দৃঢ় এবং সবসময় নির্ভীক হোক। কখনও কখনও এটি মানসিক নির্যাতনেও পরিণত হয়। ছোটখাট অভিযোগ বা মানসিক চাপও তাদের জন্য অন্তরের কষ্টের উৎস হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু সমাজে তা সহজে স্বীকার করা যায় না। এছাড়াও বহু পুরুষ ঘরের ভেতরে মানসিক ও আবেগিক নিপীড়নের শিকার হন। স্ত্রী বা প্রিয়জনের প্রতি অযৌক্তিক প্রত্যাশা, পেশাগত চাপ, পরিবারিক দায়িত্ব সব মিলিয়ে একজন পুরুষ নীরবে ভেঙে পড়েন। আর এই ভাঙন বাইরে প্রকাশ করার সাহস থাকে খুব কম। কেউ শুনতে চায় না, কেউ বোঝে না। ফলে পুরুষদের কষ্ট চুপচাপ ভেতরে জমে থাকে, যা অনেক সময় মানসিক ও শারীরিক সমস্যার দিকে নিয়ে যায়।
পুরুষের নীরব আচরণ পরিণত হয় মানসিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয়ে, যা এক পর্যায়ে ধাবিত হয় আত্মহননের পথে। পুরুষরা প্রায়শই তাদের কষ্টকে হাসি, ঠাট্টা, বা কাজের ব্যস্ততায় ঢেকে রাখে। তারা কথা বলেন না, কারণ কথা বললে সমাজের চোখে দুর্বল মনে হবে এটি আবার তাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে। এ ধরনের চাপ দিনে দিনে জমে যায়, যা মানসিক অস্থিরতা, হতাশা এবং কখনও কখনও শারীরিক অসুস্থতাও সৃষ্টি করতে পারে। চাকরির চাপ, পরিবারিক দায়িত্ব, আর সামাজিক প্রত্যাশা মিলিয়ে এই চাপ আরও ভারী হয়ে ওঠে। কেউ সহানুভূতি দেয় না, কেউ শুনে না। ফলে পুরুষদের অনেক সময় একা লড়াই করতে হয়, অদৃশ্য দেয়ালের ভেতরে বন্দি হয়ে।
পুরুষদের অদৃশ্য নির্যাতনের মূল কারণ হলো সমাজের দীর্ঘদিনের পুরুষত্বের ধারণা। ‘পুরুষ সব সহ্য করতে জানে’, ‘পুরুষ কান্না দেখাবে না’, ‘পুরুষকে সবসময় শক্ত থাকতে হবে’ এ ধরনের ভুল ধারণা তাদের চুপচাপ নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া পরিবারের ও পেশাগত দায়িত্বের ভার, সামাজিক প্রত্যাশা এবং আবেগ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুরুষদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। সহানুভূতির অভাব, পরামর্শের সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক কলঙ্ক এসব মিলে পুরুষদের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ও সংলাপের মাধ্যমে এই সমস্যা কমানো সম্ভব। পুরুষদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ সহজলভ্য করতে হবে। পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে সমর্থন বৃদ্ধি করতে হবে, যেন তারা নিজেদের কষ্ট প্রকাশ করতে লজ্জা বা ভয় না পান। শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে বোঝানো জরুরি যে, পুরুষও আবেগপ্রবণ হতে পারে, তাদেরও সাহায্য চাওয়ার অধিকার আছে। কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে পুরুষদের মানসিক চাপ কমাতে সহানুভূতি এবং সমর্থন প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পুরুষদের অদৃশ্য নির্যাতন সমাজের সবচেয়ে অদেখা কিন্তু সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। সমাজের উচিত এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে পুরুষরা নিজেদের মানসিক চাপ, নির্যাতন এবং ভয় নিরাপদভাবে প্রকাশ করতে পারে। পরিবার, বন্ধু, কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় সমর্থন ও সহানুভূতি থাকা অত্যন্ত জরুরি। চার দেয়ালের বন্ধ ঘরের ভেতরে প্রতিনিয়ত লড়াই করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ নয়। তবে সমাজের সবার সহযোগিতার মাধ্যমে পুরুষের এই নিপীড়নকে কমিয়ে আনা সম্ভব। যে পুরুষ একজন বাবা, সন্তান, স্বামী, ভাই এর চরিত্রে পরিবারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেই চলেছে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে আমরা সবাই মানবিক সহানুভূতির মাধ্যমে একটি সুস্থ সমাজ গড়তে পারি।
নুসরাত জাহান (স্মরণীকা)
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post