মনিরুল হক : অনলাইন ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ট্রেডিং মডেল ও নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। অথচ দেশের প্রচলিত আইনে এ ধরনের ব্যবসা মডেল নিষিদ্ধ। তারপরও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সাম্প্র্রতিক সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করে লোকসানসহ নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এর আগেও কতিপয় ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে উধাও হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীরা ভালো মুনাফা পেলেও শেষের দিকে যারা বিনিয়োগ করে তারা বড় ধরনের ক্ষতি শিকার হয় ।
বর্তমান সময়ে ট্রেডিং মডেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতে দেখা যায় গোল্ড কিনেন, বিনিয়োগ ও প্রমিস মার্টসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে।
গোল্ড কিনেন: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনলাইনে স্বর্ণালংকার কেনাবেচার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে ‘গোল্ড কিনেন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অ্যাপভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
গোল্ড কিনেন কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো অঙ্কের স্বর্ণ ক্রয় এবং সংরক্ষণ শুরু করা যায়। ‘গোল্ড কিনেন’ অ্যাপ ডাউনলোড করে যেকোনো স্থান থেকে অফিশিয়াল বাজারমূল্যে ২২ ক্যারট হলমার্ক প্রত্যয়িত গোল্ড কেনা যাবে মুহূর্তেই। প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত তারিখে গোল্ড সঞ্চয় করা যাবে অটো গোল্ড সেভ প্ল্যানের সঙ্গে। সর্বনিম্ন ১০০০ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত, ৩, ৬ ও ১২ মাস মেয়াদে অটো গোল্ড সেভিং শুরু করা যায় এবং প্রতি মাসে নির্ধারিত অর্থের সমপরিমাণ গোল্ড সঞ্চিত হবে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে। গোল্ড কিনেন অ্যাপে সঞ্চিত গোল্ড, যেকোনো সময় ০.৫, ১, ৫ ও ১০ গ্রামের গোল্ড বার অথবা ২ ও ৪ গ্রামের গোল্ড কয়েন আকারে উত্তোলন করা যায়।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গ্রাহকের গোল্ড ঢাকা সিটি করপোরেশনের অন্তুর্ভুক্ত এলাকায় সুরক্ষিত ও বিমাকৃত ডেলিভারির মাধ্যমে এবং দেশজুড়ে ৬৫০টিরও বেশি নির্বাচিত পিক-আপ পয়েন্টের মাধ্যমে নিরাপদে পৌঁছে দেয়া হবে গ্রাহকের কাছে। অ্যাপের মাধ্যমে সংরক্ষিত গোল্ড থেকে, প্রিয়জনকে গোল্ড উপহার দেয়া যায়। সেক্ষেত্রে প্রাপকেরও ‘গোল্ড কিনেন’ অ্যাপ থাকতে হবে, এবং নম্বর প্রবেশ করিয়ে, গিেটর পরিমাণ নির্ধারণ করে সেন্ড করে দিলেই গিফ্ট পৌঁছে যাবে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে। আবার তিনটি সহজ ধাপে বিক্রয় করা ‘গোল্ড কিনেন’ অ্যাপে সংরক্ষিত গোল্ড। নির্ধারিত পরিমানের বিক্রীত অর্থ দ্রুততর জমা হয়ে যাবে গ্রাহকের ব্যাংক অথবা মোবাইল ওয়ালেট অ্যাকাউন্টে।
তবে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অ্যাপটির কোনো স্বর্ণ মজুত নেই। তারা কেবল প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যারা অনলাইনে স্বর্ণ বিক্রির দাবি করছেন, তাদের কাছে আদৌ সোনা আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটির সদস্য পদ স্থগিত করেছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)।
আইটি খাতে এমন অননুমোদিত লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে এমন অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান কৃষিভিত্তিক প্রকল্পের শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ তুলছে, কোনো প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মতো করে ক্রাউড ফান্ডিং করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বা প্রতারণা করলে গ্রাহকের টাকা ফেরতের উপায় থাকবে না।
এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্ব বর্তায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর। তাদের কঠোর নজরদারি গ্রাহকদের এ ধরনের প্রতারণার ফাঁদ থেকে উদ্ধার করতে পারে।
জানা গেছে, এ ধরনের আরও ট্রেডিং-সংক্রান্ত ব্যবসা খুলে বসেছে ‘বিনিয়োগ’ ও ‘প্রমিস মার্ট’ নামের দু’টি প্রতিষ্ঠান।
বিনিয়োগ: বিনিয়োগ নামেও একটি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিংয়ের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। এই প্রতিষ্ঠানে প্রথমে একটা বিও অ্যাকাউন্ট ওপেন করতে হয়। বিও অ্যাকাউন্ট ওপেন করার পর টাকা ডিপোজিট করতে হয়। এরপর তাদের অনলাইনে বাই সেল অর্ডার দেওয়া যায়। অনলাইনে এআই অ্যানালাইসিসগুলো, শেয়ার মার্কেটে যে অ্যানালাইসিসগুলো আছে বা ইনস্ট্রুমেন্টের অ্যানালাইসিসগুলো, ওগুলো দেখে ইনভেস্টররা সিদ্ধান্ত নিবেন যে কোন কোন শেয়ারটা ভালো হতে পারে। সেই মোতাবেক শেয়ার কিনতে পারবেন। কিনলে এরপর বিক্রিও করতে পারবে। তাদের ওয়েবসাইট থেকেই এগুলো সব মেইনটেইন করা যায়। মুনাফা তুলতে আবেদন করতে হয়। মুনাফা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইনভেস্টররা তাদের অনলাইনের মাধ্যমেও ইনভেস্ট করতে পারবে ডিএক্সএনটি দিয়ে। এভাবে সম্পূর্ণ অনলানেই সব কার্যক্রম করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তারা জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের একটা ট্রেড হোল্ডার, তাদের ট্রেড হোল্ডার কনসার্ভেশন নেয়া আছে। তাদের এই ট্রেড হোল্ডারের মাধ্যমেই সব ট্রানজেকশন হয়। মেম্বার নাম্বার ১২২, বা ট্রেড নাম্বার ১২২ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের।
প্রমিস মার্ট: ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে নগদহাট বাংলাদেশ লি. নামে। সমপ্রতি নাম বদলে করা হয়েছে প্রমিস মার্ট লি.। অভিযোগ আছে, এই প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের আড়ালে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিংয়ের (এমএলএম) মতো করে ব্যবসা করছে। তারা গ্রাহকের কাছে পণ্য বিক্রি করে, তা আবার অন্যদের কাছে বিক্রি করে মুনাফা দেয়ার অফার করে। এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য তারা সর্বোচ্চ ৩৬ মাস সময় নেয়।
এই প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ৩৬ মাসে গ্রাহক মোট ৯ লাখ টাকা ফেরত পাবে বলে জানায় প্রমিস মার্ট। অর্থাৎ তিন বছরে চার লাখ টাকা মুনাফা পাবে বিনিয়োগকারী, যা এমএলএম ব্যবসার ধরনের সঙ্গে মিলে যায়। এখানে কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারলে তার বিনিয়োগকৃত অর্থ থেকে তিন শতাংশ অর্থ প্রথম বিনিয়োগকারী পাবেন। এরপর দ্বিতীয় বিনিয়োগকারী যদি কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারেন, তাহলে দ্বিতীয় বিনিয়োগকারী পাবেন তিন শতাংশ এবং প্রথম বিনিয়োগকারী পাবেন এক শতাংশ। এভাবে যত বিনিয়োগ বাড়বে তত র্যাঙ্ক বাড়বে। সর্বনিম্ন র্যাঙ্ক এক্সিকিউটিভ হতে হলে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করাতে হবে।
সমপ্রতি কল্যাণপুরে তাদের অফিসে সরেজমিন ঘুরে সেখানে উপস্থিত লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়।
প্রমিস মার্টের বিনিয়োগ কার্যক্রম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এখানে রেজিস্ট্রেশন করালে একটি ড্যাশবোর্ড দেখা যাবে, যেখান থেকে বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে দেখা যায় এবং টাকা উত্তোলনের আবেদন করতে হয়। প্রমিস গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদ আলম।
খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ ধরনের অননুমোদিত ব্যবসা মডেল দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা শেয়ার বিজকে বলেন, ভবিষ্যতে যদি বড় ধরনের কোনো স্ক্যাম (প্রতারণা) ঘটে, তা ঘটবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। এ খাতে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান অননুমোদিত বিজনেস মডেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছে। এই টাকা সঠিকভাবে ফেরত দিতে পারবে না অনেক প্রতিষ্ঠান। তখন বড় ধরনের একটি অঘটন ঘটবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১-এর ধারা ৩.১.৩-এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্সের মাধ্যমে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা নেটওয়ার্ক ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।’
এছাড়া ৩.১.১০ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ব্যতিরেকে ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ধরনের অর্থ ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, অননুমোদিত বিজনেস মডেলে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। আমরা বিজ্ঞপ্তি আকারে মানুষকে সতর্ক করেছি যে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনের ফাঁদে কেউ যাতে পা না দেন।’
সার্বিক বিষয়ে শেয়ার বিজ কথা বলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সমপ্রতি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোয় কিছু জালিয়াতি হয়েছে। তাদের কেস নিয়ে আমরা কাজ করছি। সার্বিকভাবে আমরা অনলাইন ব্যবসা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এমন কিছু উদ্যোগ নিচ্ছি যা বাস্তবায়ন হয়ে এ খাতের জালিয়াতি কমে আসবে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারির আগে যাতে প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নিতে না পারে, সেজন্য সারা বিশ্বে সেন্ট্রাল লজিস্টিক ট্রাকিং প্ল্যাটফর্ম (সিএলটিপি) ব্যবহার করা হয়। আমরা এখানেও সিএলটিপি চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। এটা পাইলটিং চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের জালিয়াতি রোধে সিএলটিপির পরিপূর্ণ ব্যবহারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যুক্ত করতে হবে। এটা হলে অনলাইনে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে তা মেরে দেয়ার সুযোগটা থাকবে না।’
অতীতে যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ডে অনেক গ্রাহক কষ্টার্জিত অর্থ খুইয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশে যখন ব্যাংকিং চ্যানেলে সুদের হার কম, তখন সাধারণ মানুষ অপেক্ষাকৃত বেশি মুনাফার আশায় এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করে। তারা ভুলে যায় অনুমোদনহীন এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই কঠিন। সামান্য সংকটে পড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post