জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন : বর্তমান যুগ তথ্য ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগ। হাতের নাগালে সারাবিশ্বের জ্ঞানভান্ডার থাকা সত্ত্বেও এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে আমাদের সমাজে—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। অজানাকে জানার যে শাশ্বত কৌতূহল মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য, তাতে যেন মরচে ধরতে শুরু করেছে। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে জীবনমুখী শিক্ষা, সবক্ষেত্রেই এক ধরনের অনীহা ও অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতাকে একটি জাতির মেধা ও মননের দেউলিয়াপনা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই স্বর্ণযুগে কেন আমাদের শেখার আগ্রহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে?
শেখার আগ্রহ কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তথ্যের অতি-লভ্যতা বা ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’। ইন্টারনেটের কল্যাণে যেকোনো তথ্য এখন এক ক্লিকেই পাওয়া যায়। ফলে কোনো কিছু গভীরভাবে জানার বা মুখস্থ রাখার প্রয়োজনীয়তা মানুষ অনুভব করছে না। আগে একটি তথ্যের জন্য লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হতো, যা ধৈর্য ও কৌতূহল বাড়িয়ে দিত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সার্চ ইঞ্জিনের ওপর অতিনির্ভরতা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে অলস করে দিচ্ছে। পাশাপাশি, সামাজিক মাধ্যমের ‘শর্ট ভিডিও’ বা ‘রিলস’ কালচার মানুষের মনোযোগের ব্যাপ্তিকে কমিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ কোনো বই পড়া বা গভীর কোনো বিষয় বোঝার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে বর্তমান প্রজন্ম।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই আনন্দহীন ও যান্ত্রিক। এখানে শেখার চেয়ে ‘ভালো ফল’ করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। জিপিএ-৫ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যার দিকে ঝুঁকছে। যখন শিক্ষা কেবল একটি সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা এখন শিখছে কেবল পরীক্ষায় উতরানোর জন্য, জানার জন্য নয়। এই নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি তরুণদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিচ্ছে যে, পরীক্ষায় ভালো করাই শেষ কথা। ফলে সিলেবাসের বাইরের কোনো কিছু পড়ার বা জানার আগ্রহ তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না।
শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহের পেছনে একটি বড় কারণ হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও যখন একজন মেধাবী তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। ‘পড়ে কী হবে?’ এই নেতিবাচক প্রশ্নটি তরুণ মনে বিষের মতো কাজ করছে। যখন দেখা যায় মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে তদবির বা অর্থই সফলতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন শেখার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ হারানোই স্বাভাবিক। এ হতাশা থেকেই অনেকে মনে করছেন, জ্ঞান অর্জনের চেয়ে দ্রুত টাকা উপার্জনের পথ খোঁজা বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।
এক সময় পরিবারে বড়দের মুখে গল্প শোনা বা একসাথে বসে পত্রিকা পড়ার চল ছিল, যা শিশুদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলত। এখনকার ডিজিটাল পরিবারগুলোয় সবাই নিজ নিজ স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত। মা-বাবা সন্তানদের হাতে খেলনা বা বইয়ের বদলে ট্যাব বা মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। ফলে শৈশব থেকেই শিশুরা স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে। সমাজে এখন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার চেয়ে সস্তা বিনোদনের কদর বেশি। বইমেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চেয়ে মানুষ শপিং মল বা ফাস্টফুড দোকানে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করছে। এ পরিবেশটিই মূলত একজন শিক্ষার্থীর ভেতরকার জ্ঞানতৃষ্ণাকে মেরে ফেলছে।
বর্তমান সময়ে ‘ইনস্ট্যান্ট সাকসেস’ বা রাতারাতি সফল হওয়ার নেশা আমাদের গ্রাস করেছে। শেখা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যার ফল পেতে সময় লাগে। কিন্তু গ্ল্যামার জগৎ এবং ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবন দেখে তরুণরা মনে করছে কঠোর পরিশ্রম বা পড়াশোনা ছাড়াই সফল হওয়া সম্ভব। এ সহজলভ্য সাফল্যের হাতছানি তাদের ধৈর্যশীল জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত করছে। গভীর জীবনদর্শনের চেয়ে বাহ্যিক জৌলুস যখন বেশি গুরুত্ব পায়, তখন শেখার মতো শ্রমসাধ্য কাজ থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণ পেতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও জীবনমুখী করতে হবে। মুখস্থবিদ্যার চেয়ে হাতে-কলমে শেখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সন্তানদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে; যাতে তরুণরা জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত হয়। সর্বোপরি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, বিনোদনের একমাত্র উৎস হিসেবে নয়।
একটি জাতি কতটা উন্নত, তা নির্ভর করে সেই জাতির জ্ঞানতৃষ্ণার ওপর। শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা মানে হলো স্থবির হয়ে যাওয়া। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ স্থবিরতা থেকে বাঁচাতে হলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৌতূহলহীন সমাজ কেবল যান্ত্রিক মানুষ তৈরি করতে পারে, কোনো মহানায়ক বা বিজ্ঞানী নয়। তাই সময় থাকতেই আমাদের সচেতন হতে হবে, যাতে শেখার আনন্দ আবার ফিরে আসে প্রতিটি প্রাণের গভীরে।
শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post