পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে, এটি স্বস্তির খবর। পাশাপাশি দৈনিক শেয়ার বিজ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ৪৬টি লাইটার জাহাজে প্রায় ২৩ লাখ পণ্য ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে আটকে আছে। আমদানির বড় একটা যদি কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কৌশলগতভাবে আটকে রাখে, তবে সেটি স্বস্তির বদলে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাজারে অস্থিরতাকে উসকে দেবে। পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে, যা অশনিসংকেত। কাজেই বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
অভিযোগ উঠেছে, কিছু বড় আমদানিকারক ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য খালাস বিলম্বিত করে বাজারে সরবরাহ কম দেখাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই-রমজানের চাহিদাকে পুঁজি করে দাম বাড়ানো। এই কৌশল হয়তো স্বল্প মেয়াদে অতিরিক্ত মুনাফা এনে দিতে পারে, কিন্তু এর পরিণতি ভয়াবহ। কারণ যখন কাক্সিক্ষত দামে পৌঁছে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পণ্য একসঙ্গে খালাসের চাপ আসবে, তখন চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে চাপে পড়বে।
বাস্তবতা হলো-আমাদের বন্দর ও নদীপথে পণ্য খালাস এখনো অনেকাংশে সনাতন ও ধীরগতির। লাইটার জাহাজের সংখ্যা কমেছে, জেটি সীমিত, শ্রমিক সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় যদি একসঙ্গে লাখ লাখ টন পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হয়, তবে জট অনিবার্য। জট মানেই ডেমারেজ চার্জ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের বোঝা পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে। অর্থাৎ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যে লাভের হিসাব কষা হচ্ছে, তার ক্ষতি বহুগুণে সমাজকে বহন করতে হবে।
ইতোমধ্যে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসনিক তৎপরতা আশার সঞ্চার করেছে। ১৫ দিনের বেশি পণ্য আটকে রাখায় নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা ও মামলা করার হুঁশিয়ারি-এসব পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী। তবে প্রশ্ন হলো, এই তৎপরতা কি যথেষ্ট? অভিজ্ঞতা বলে, উৎসব বা রমজান এলেই বাজারে ‘অদৃশ্য হাত’ সক্রিয় হয়। তাই এখানে অস্থায়ী অভিযান নয়, দরকার ধারাবাহিক ও কঠোর নজরদারি। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এখন তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, ভাসমান গুদাম তৈরির প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন্দর ও নদীপথে খালাস সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাপনা-অতিরিক্ত জেটি ব্যবহার, শিফটভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ এবং সমন্বিত সময়সূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, বাজারে সরবরাহ ও মজুতের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ না থাকে।
দেশের একশ্রেণির ব্যবসায়ী পবিত্র রমজান মাসকে পুঁজি করে নানাভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করে। মনে রাখতে হবে রমজান মানে সংযম, ন্যায্যতা ও সহমর্মিতা। এ সময়ে বাজারে কারসাজি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতাও বটে। যদি এখনই ‘ভাসমান গুদাম’ সংস্কৃতির লাগাম টানা না যায়, তবে রমজানের আগ মুহূর্তে একদিকে লাগামছাড়া দাম, অন্যদিকে বন্দরের অচলাবস্থাÑএই দ্বিমুখী সংকট দেশকেই বিপদে ফেলবে। সময় থাকতে সতর্ক ও কঠোর হওয়াই এখন একমাত্র পথ।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post