নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের ক্ষমতায় অপব্যবহার হওয়া অর্থ ও সংকটাপন্ন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঢেলে সাজাতে চট্টগ্রামের দুই বীর পুত্রের উপর ভরসা রেখেছেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সূচনা হলো নতুন এক অধ্যায়ের। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন চট্টগ্রামের দুই জনপ্রিয় নেতা—আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। প্রথমবারের মত চট্টগ্রাম থেকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। আর ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মত বাঙালি কোন নেতাকে করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তাদের দুইজনের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ১৮ মিনিটে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আমীর খসরু। ৪টা ২৬ মিনিটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল। শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
নতুন মন্ত্রিসভার ৫০ জন সদস্যের মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। সাধারণত বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়া মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান এবার হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। একই দিনে সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর রিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৭৬ হাজার ৬৯১ ভোট। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু তাহের লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ১০ হাজার ৪ ভোট। চট্টগ্রাম-১১ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ১৪৪টি। মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৮ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার ৬৮২ জন, যা মোট ভোটারের ৪১ দশমিক ৭০ শতাংশ।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এত বছর পরে একটি নির্বাচিত সংসদ হয়েছে। এটা সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। বাংলাদেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন, জনগণের কাছে তিনি দায়বদ্ধ থাকবেন। নির্বাচিত হওয়ার আনন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পৃক্ত। তাই আজকে আনন্দের দিন, আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাচ্ছি। মানুষের মালিকানার জন্য আমরা এত বছর সংগ্রাম করেছি, আমরা মনে করি সেদিকে আমরা যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হচ্ছে মানুষ মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে, প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে। বিষয়টি কার্যকর করার জন্য সকল সংসদ সদস্যেরকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৫ আসনে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বড় ব্যবধানে জয়ী হন। হাটহাজারী উপজেলা ও বায়েজিদ আংশিক নিয়ে গঠিত এ আসনের ১৪৩টি কেন্দ্রে তিনি পান ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৬৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. নাসির উদ্দীন পান ৪৬ হাজার ৫৮৯ ভোট।
মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তরুণদের আস্থায় রাখতে চান। এর পরিচায়ক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে লক্ষাধিক ভোটে জয়ী করার জন্য হাটহাজারীবাসীকে ধন্যবাদ। হাটহাজারীর উন্নয়নের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও ভূমিকা থাকবে আমার।
জানা যায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক জীবনে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে প্রথমবারের মত বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৫ মার্চ ২০০৪ পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘স্থায়ী কমিটি’-এর সদস্য এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার অনারারি কনসাল, সোনালী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও শিল্প বিভাগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, মীর হেলালের জন্ম ১৯৮২ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মীরেরখিল এলাকার মীর বাড়িতে। তাঁর বাবা মীর নাছির একসময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় গেলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
মীর হেলাল ২০০২ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন থেকে এলএলবি (অনার্স) করেন। এরপর ২০০৩ সালে কলেজ অব ল অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস (ইউনিভার্সিটি অব ল) থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ২০০৪ সালে অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার অ্যাট ল হিসেবে স্বীকৃতি পান। আইন পেশায় যুক্ত মীর হেলাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তালিকাভুক্ত আইনজীবী। তিনি ল ফার্ম ‘দ্য লয়ার্স কাউন্সিল’-এর হেড অব চেম্বার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাবার পথ ধরে বিএনপিতে যুক্ত হওয়া মীর হেলাল বর্তমানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ)। এছাড়া তিনি বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং তারেক রহমান পরিচালিত ‘লিগ্যাল রিসার্চ সেল’-এর আহ্বায়ক। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিরও সদস্য।
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক এবং নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ন্যাশনালিজম স্টাডিজ (সিএনএস)’-এর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন মীর হেলাল। তিনি হাটহাজারীর ‘মীর নোয়াবুল হক মেমোরিয়াল হাইস্কুল’-এর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া পারিবারিক চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ‘ডালিয়া-নুসরাত মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
একে
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post