আনোয়ার হোসাইন সোহেল ও আমানুর রহমান খোকন: দুর্নীতি, অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জর্জরিত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে গ্রাহকদের বীমা দাবি দ্রুত পরিশোধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সংস্থাটি কোম্পানিকে তাদের সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।
দেশজুড়ে কয়েক লাখ গ্রাহকের বিপরীতে কোম্পানিটির কাছে জমে থাকা বীমা দাবির পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। কোম্পানির নিজস্ব হিসাবে এই পাওনা প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা হলেও, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিভিন্ন সূত্রে তা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। অথচ এই বিপুল দায়ের বিপরীতে কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত পরিশোধ করতে পেরেছে মাত্র ১৯৪ কোটি টাকা, যা মোট দাবির মাত্র ৬ শতাংশ।
বর্তমানে কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে আইডিআরএ। ফলে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত কোনো কর্মপরিকল্পনা জমা না দেওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে নিয়ন্ত্রক মহলে।
কুড়িগ্রামে এক লাখ গ্রাহকের করুণ বাস্তবতা: উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামে এই সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক বীমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় এক লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ১০০ কোটি টাকার কোনো সুনির্দিষ্ট হদিস নেই।
২০০০ সালের পর থেকে কোম্পানিটি কুড়িগ্রামের জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে অফিস খুলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে বীমা কার্যক্রম চালায়। সহজ শর্ত, ছোট কিস্তি এবং ‘ইসলামী’ তকমা ব্যবহার করে গৃহিণী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নিম্নআয়ের মানুষদের আকৃষ্ট করা হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় এক লাখ গ্রাহক তৈরি করে কোম্পানির মাঠকর্মী, কমিশনভিত্তিক এজেন্ট ও ব্রোকাররা। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে শুরু হয় বিপর্যয়। মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির টাকা পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায় এবং গ্রাহকদের হয়রানি শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রাতারাতি ইউনিয়ন ও উপজেলা অফিস গুটিয়ে ফেলা, অফিস স্থানান্তর, কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি কিংবা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো নানা অজুহাতে গ্রাহকদের বছরের পর বছর ঘুরতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সিরিয়ালের ফাঁদে আটকা গ্রাহকের টাকা: কোম্পানিটি দাবি করছে, ফান্ড ট্রান্সফার (এফটি) নম্বর অনুযায়ী তালিকা করে ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া গ্রাহকদের জন্য নতুন এক অনিশ্চয়তার জš§ দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম মডেল জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার গ্রাহকদের জন্য একটি সিরিয়াল নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই সিরিয়াল এত দীর্ঘ যে অনেক গ্রাহককে টাকা পেতে আরও পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সদর উপজেলার ঘোগাদহ গ্রামের হতদরিদ্র গৃহিণী আফরোজা খাতুন বলেন, ‘মুরগির ডিম বিক্রি আর সংসারের খরচ বাঁচিয়ে কিস্তি দিয়েছি। দুই বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনও টাকা পাইনি। আমার সিরিয়াল ১৮৪৭Ñকবে টাকা পাব জানি না।’
ফুলবাড়ীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুর আমিন বলেন, ‘ইসলামী বীমা শুনে বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছি। এখন ইউনিয়ন অফিস নেই, উপজেলা অফিসে তথ্য নেই, জেলা অফিসে গেলে ম্যানেজার নেই। আমার সিরিয়াল ২৩০১Ñএই অবস্থায় কবে টাকা পাব, কেউ বলতে পারে না।’
উলিপুরের দিনমজুর কামরুল নাহার বলেন, ‘১০ বছরের পলিসি করেছি। মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালে। তিন বছর হয়ে গেল, এখনও টাকা পাইনি। আমরা গরিব মানুষÑএই টাকা না পেলে বাঁচব কীভাবে?’
কোম্পানির ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকার তালিকা: ফারইস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আব্দুর রহিম ভূঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে বিপুল পরিমাণ দাবি বকেয়া থাকলেও ধাপে ধাপে তা পরিশোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ফান্ড ট্রান্সফার নম্বর ধরে তালিকা তৈরি করেছি। মৃত গ্রাহকের পরিবার, বিদেশগামী ব্যক্তি এবং গুরুতর অসুস্থ গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত পরিশোধ করা হচ্ছে।’
তবে বাস্তবে এই অগ্রাধিকার তালিকা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অগ্রাধিকার পাওয়া যাচ্ছে না এবং প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ নয়।
আর্থিক সংকট, কর্মী ছাঁটাই ও সম্পদ বিক্রি: দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট মোকাবেলায় কোম্পানিটি ইতোমধ্যে ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নিয়েছে। গাড়ি বিক্রি, কর্মী ছাঁটাইসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যয় কমানো দিয়ে এত বড় দায় পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও দ্রুত বিক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্য পাচার ও প্রতারণার নতুন ফাঁদ : সংকটের মধ্যেই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর গ্রাহকরা নতুন ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতারক চক্র কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয়ে গ্রাহকদের ফোন করে ব্যাংক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে এবং অর্থ আত্মসাৎ করছে।
এই ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সাবেক মুখ্য নির্বাহীসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা অবৈধভাবে কোম্পানির ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ করে সংবেদনশীল তথ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেছেন।
বেক্সিমকো সংশ্লিষ্টতা ও পর্ষদ পুনর্গঠন: কোম্পানিটির মালিকানা ও পরিচালনায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে এতে যুক্ত হয় বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০২১ সালে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে নতুন বোর্ড গঠন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ লোপাটের তথ্য উঠে আসার পর বিনিয়োগকারী ও পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে, আইডিআরএর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোম্পানিকে দ্রুত একটি কার্যকর পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটির মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ দাবি বকেয়া রয়েছে। আমরা কোম্পানিকে সম্পদ বিক্রি করে হলেও দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশনা না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আস্থার সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেশের বীমা খাতে আস্থার বড় সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু একটি কোম্পানির সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো বীমা খাতের তদারকি, সুশাসন এবং জবাবদিহিতার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post