নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ ব্যাংক হিসাবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা এবং ব্যাংকটির গ্রাহকরা গতকাল রোববার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে। ওইদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ব্যানারে কয়েকশ কর্মকর্তা ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ এবং অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে তারা ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ পুনর্বহাল এবং চাকরি ফেরতের দাবি জানান। আর দুপর সাড়ে ১২টার দিকে ইসলামী ব্যাংকের সামনে চাকরিচ্যুতদের ধাওয়া দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে গ্রাহক ও ভুক্তভোগী সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে পাল্টা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তারা এস আলমের শাস্তির জন্য গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। এতে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এমনকি কিছু গ্রাহক টাকাও উত্তোলন করেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শরিয়াহ পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী মানববন্ধন করেন। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অন্যায়ভাবে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে দাবি করেন। সে জন্য চাকরিতে তাদের দ্রুত পুনর্বহাল করার দাবি জানান। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে এস আলমের হাতে মালিকানা ফিরিয়ে দিতে হুমকি দেন। দাবি পূরণ না হলে আগামী ১৫ দিন পর কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত ধ্বংসকারী পলাতক ‘মনসুরের বিচার চাই’, ‘রাজনীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ সেøাগান লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল।
তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ছাড়া তারা দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে নিয়োগ, বর্তমান ব্যবস্থাপনার অনিয়ম এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা আফরাদ হোসেন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পর আমাকে বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। আমার একটা অপরাধ আমার বাড়ি পটিয়া। শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে পটিয়াবাসী অনেকেই ব্যাংক থেকে তখন চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমরা আমাদের চাকরিতে পুনর্বহাল চাই। আমাদের একটাই দাবি, আমাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’
অপরদিকে, ইসলামী ধারার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধনের প্রায় শেষের দিকে দুপুরে একই স্থানে ইসলামী ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে আরেকটি গ্রুপ তাদের দাবি নিয়ে মানববন্ধন করেন। তাদের একটাই দাবি, ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি ব্যাংক যাতে পুনরায় এস আলমের হাতে তুলে না দেওয়া হয়। ব্যাংক লুটেরা এস আলম ও সব শীর্ষ লুটেরাদের গ্রেপ্তার এবং দেশীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে হবে। ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনে সংযোজিত ১৮/ক ধারা বাতিল করতে হবে, ব্যাংকের সামনে অবৈধভাবে মব সৃষ্টিকারী এস আলমের দোসর, পটিয়া বাহিনীকে পুনরায় সুযোগ দেওয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।
ওই মানববন্ধনে মব সৃষ্টিকারী কোনো অবৈধ দখলদার বাহিনীকে ব্যাংকে প্রবেশের সুযোগ দিলে তা বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ব্যাংকের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই গ্রুপের কর্মসূচির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানববন্ধন কর্মসূচির কারণে গ্রাহকরা ব্যাংকে এলেও কেউ কেউ আতঙ্কে লেনদেন করতে পারেনি। ইসলামী ব্যাংক মতিঝিল শাখার গ্রাহক মতিউর রহমান জানান, আসছিলাম ব্যাংকে কিছু নগদ টাকা তুলতে। কিন্তু মতিঝিল এলাকার পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে টাকা না তুলেই ফির যান তিনি।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরচালক (চলদি দায়িত্ব) মো. আলতাফ হোসেন বলেন, তারা ব্যাংকের দৃষ্টিতে যৌক্তিক কারণে চাকরিচ্যুত। তারা সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে সরব। তারা পূর্বের ধারাবাহিকতায় মাঠে নেমেছে। তারা চাকরি ফেরতের দাবি জানাতে পারে। তবে কোনো গ্রুপকে মালিকানা ফেরতের দাবি বা হুমকি দিতে পারেন না। কারণ বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন রয়েছে। আদালতের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা উচিত। তাদের দীর্ঘদিনের এসব আন্দোলনে ব্যাংকের তো কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং আমানত বেড়েছে। ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। আশা করা যায়, তাদের আন্দোলন গ্রাহকের ওপর প্রভাব ফেলবে না।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুর নবী মানিক। তিনি বলেন, একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে ব্যাংকটিকে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হয়। ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যানকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং একই রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যদি ইসলামী ব্যাংকের সামনে এ ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে গ্রাহকরা বসে থাকবে না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে পাল্টা কর্মসূচি গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post