শিক্ষা ডেস্ক: একবার চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করুন তো! সকালের ঝলমলে রোদ এসে পড়েছে ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে। ক্লাস শেষে ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা দিচ্ছে একদল তরুণ-তরুণী। তাদের মধ্যে একজন হয়তো নেপালের, সে বাংলায় তার ভাঙা ভাঙা অনুভূতি প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। পাশে বসা নাইজেরিয়ার ছেলেটি হাসতে হাসতে তাকে সাহায্য করছে, আর আমাদের দেশেরই একটি মেয়ে তাদের বোঝাচ্ছেÑকীভাবে এখানকার লোকাল বাসে চড়তে হয়।
দৃশ্যটি কোনো ইউরোপ বা আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এটি হতে পারে আমাদেরই দেশের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের চিত্র।
কিন্তু বাস্তবে এমনটা কি আমরা খুব একটা দেখি? খুব কম। অথচ, একটু মনোযোগ দিলেই আমরা আমাদের দেশটাকে পরিণত করতে পারি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় ‘এডুকেশন হাব’ বা শিক্ষাকেন্দ্রে। আজকের এই আলোচনাটি মূলত আমাদের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং দেশ গড়ার কারিগরদের জন্য। আসুন, একটা গল্প দিয়ে শুরু করিÑকীভাবে অন্যরা শিক্ষাকে শুধু জ্ঞান বিতরণের জায়গা থেকে একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত করেছে।
উন্নত বিশ্বের ম্যাজিক: তারা কীভাবে করে?
আমরা যদি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য বা কানাডার দিকে তাকাই, দেখব তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো এই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। কানাডার কথাই ধরুন। তারা জানে, সারা বিশ্ব থেকে মেধা আকর্ষণ করতে হলে শুধু ভালো ক্লাসরুম থাকলেই চলবে না। তারা শিক্ষাকে একটি ‘অভিজ্ঞতা’ এবং উন্নত জীবনের ‘সিঁড়ি’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
তাদের মডেলটি খুব পরিষ্কার। প্রথমত, তারা পড়াশোনার মান আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে, যাতে তারা নিজেদের খরচ মেটাতে পারে। আর পড়াশোনা শেষে দিচ্ছে ‘পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা’ বা কাজের সুযোগ। এর ফলে কী হচ্ছে? বিশ্বের সেরা মেধাবীরা সেখানে যাচ্ছে। তারা টিউশন ফি হিসেবে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে, ওই দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে, আর দিন শেষে সেই দেশেরই আইটি, স্বাস্থ্য বা ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে নিজেদের মেধা কাজে লাগাচ্ছে। একেই বলে ‘ব্রেইন গেইন’ বা মেধা অর্জন।
কেন আমরাও এই পথে হাঁটব? (ইতিবাচক দিক)
আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারেÑনিজেদের দেশের ছেলেমেয়েদেরই যেখানে ঠিকমতো সিট দিতে পারছি না, সেখানে বিদেশিদের এনে আমাদের কী লাভ? লাভ আসলে বহুমুখীÑ
অর্থনৈতিক বিপ্লব: একজন বিদেশি শিক্ষার্থী যখন আমাদের দেশে আসে, সে শুধু টিউশন ফি দেয় না; সে বাসা ভাড়া নেয়, খাবার কেনে, যাতায়াত করে, কেনাকাটা করে। এর পুরো টাকাটাই বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে আমাদের অর্থনীতিতে যোগ হয়।
সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক শক্তি: ভুটান, মালদ্বীপ বা আফ্রিকার কোনো দেশের একজন শিক্ষার্থী যখন আমাদের দেশে পড়ে ফিরে যাবে, সে আসলে আমাদের দেশের একজন অঘোষিত ‘রাষ্ট্রদূত’ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে সে যখন তার দেশের কোনো বড় পদে বসবে, বাংলাদেশের প্রতি তার একটি আলাদা সফট কর্নার বা দুর্বলতা থাকবে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি অমূল্য।
স্থানীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন: বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাধ্য হয়েই তাদের সিলেবাস, পড়ানোর ধরন এবং গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হবে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে; কিন্তু আমাদের দেশেরই সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশের মাটিতে বসেই বিভিন্ন দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তারা হয়ে উঠবে সত্যিকারের গ্লোবাল সিটিজেন।
মুদ্রার উল্টোপিঠ: শঙ্কার জায়গাগুলো কোথায়? (নেতিবাচক দিক)
সব ভালো উদ্যোগেরই কিছু চ্যালেঞ্জ বা শঙ্কার জায়গা থাকে। সেগুলো আগে থেকে না ভাবলে হোঁচট খেতে হবেÑ
অবকাঠামোর ওপর চাপ: ঢাকা বা বড় শহরগুলোয় এমনিতেই যানজট আর বাসস্থানের সংকট রয়েছে। বিপুলসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী এলে তাদের মানসম্মত বাসস্থানের অভাব প্রকট হতে পারে।
‘ডিগ্রি বিক্রির’ কারখানা: নজরদারি না থাকলে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল বিদেশিদের কাছ থেকে টাকা হাতানোর জন্য মানহীন ডিগ্রি দেওয়া শুরু করতে পারে, যা বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের দুর্নাম বয়ে আনবে।
সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব: ভিন্ন সংস্কৃতি, পোশাক বা খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্থানীয়দের সাথে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝি বা দূরত্বের সৃষ্টি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও ভিসার অপব্যবহার: অনেকেই হয়তো স্টুডেন্ট ভিসায় এসে পড়াশোনা না করে অন্য কোনো বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।
অদৃশ্য দেয়াল: বাধাগুলো কী কী?
আমাদের স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বেশ কিছু বড় পাথর বিছানো আছেÑ
১. জটিল ভিসা প্রক্রিয়া: একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য আমাদের দেশের স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়া এবং তা প্রতি বছর নবায়ন করা আক্ষরিক অর্থেই এক যুদ্ধ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেকেই মাঝপথে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
২. মানসম্মত বাসস্থানের অভাব: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পরিষ্কার এবং সব সুবিধা-সংবলিত হোস্টেল বা ডরমিটরি আমাদের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই।
৩. তথ্য ও প্রচারের অভাব: বিদেশি শিক্ষার্থীরা সাধারণত ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজে। কিন্তু আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেরই বেহাল দশা। সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো পোর্টাল বা পরিষ্কার গাইডলাইন নেই।
৪. র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা: বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংগুলোয় আমাদের উপস্থিতি বেশ হতাশাজনক। ফলে প্রথম সারির মেধাবীরা এদিকে আসতে চায় না।
দেয়াল ভাঙার উপায়: নীতিনির্ধারকদের জন্য করণীয়
এই বাধাগুলো দূর করা খুব কঠিন কিছু নয়, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনা। আসুন দেখি কীভাবে আমরা এই বাধাগুলো টপকাতে পারিÑ
১. ‘ওয়ান-স্টপ’ ভিসা সার্ভিস চালু করা: শিক্ষার্থীদের ভিসার জন্য যেন মাসের পর মাস ঘুরতে না হয়, সেজন্য একটি আলাদা ‘স্টুডেন্ট ভিসা সেল’ তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে ইমিগ্রেশন পুলিশের সরাসরি সমন্বয় থাকতে হবে, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং অনলাইনে সম্পন্ন হয়।
২. টার্গেট মার্কেট ঠিক করা: শুরুতেই আমরা হয়তো আমেরিকা বা ইউরোপের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারব না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষিণ এশিয়া (নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা), মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাদের কাছে আমাদের মূল আকর্ষণ হবেÑ‘অল্প খরচে মানসম্মত আন্তর্জাতিক শিক্ষা’।
৩. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: সরকার এবং বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশেপাশে ‘স্টুডেন্ট ভিলেজ’ বা মানসম্মত হোস্টেল নির্মাণ করা যেতে পারে। এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্যও একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে।
৪. পড়াশোনায় ইংরেজি মাধ্যমকে জোর দেওয়া: বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে, সম্পূর্ণ ইংরেজিতে পড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদেরও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৫. স্কলারশিপ ও খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ: মেধাবী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে কিছু ‘বঙ্গবন্ধু গ্লোবাল স্কলারশিপ’ বা এই জাতীয় বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া ক্যাম্পাসের ভেতরেই (লাইব্রেরি, ল্যাব, ক্যাফেটেরিয়ায়) তাদের জন্য সীমিত পরিসরে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ রাখা যায়।
৬. কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ: যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে, তাদের জন্য একটি আলাদা ‘অ্যাক্রেডিটেশন বা মান নিয়ন্ত্রণ বোর্ড’ থাকতে হবে। যারা শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোরতা দেখাতে হবে।
শেষকথা: পৃথিবী এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। শিক্ষাকে এখন আর শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালের মধ্যে বা দেশের সীমানায় আটকে রাখার সুযোগ নেই। আজ যে দেশটি শিক্ষার দিক থেকে যত বেশি উš§ুক্ত, আগামী দিনের পৃথিবীতে তারাই তত বেশি নেতৃত্ব দেবে।
আমাদের দেশের মানুষের আতিথেয়তা সারা বিশ্বে সমাদৃত। আমাদের আছে তরুণ এবং মেধাবী শিক্ষক সমাজ। নীতিনির্ধারক হিসেবে আপনারা যদি শুধু পলিসি বা নিয়মগুলোকে একটু সহজ করে দেন, তবে আমাদের এই দেশটিও হয়ে উঠতে পারে এশিয়ার অন্যতম সেরা একটি ‘এডুকেশন হাব’।
আসুন, আমরা এমন একটি আগামীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের তরুণেরা শুধু আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের কথা জানবে না, জানবে আমাদের শিক্ষার মানের কথাও। তারা হাসিমুখে বলবে, ‘পড়াশোনার জন্য আমার প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ!’
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post