হাসান শিরাজী: ধরে নিন, আমাদের পরিচিত দুই তরুণ-তরুণী রাহাত আর সুমি। রাহাত সবসময় ক্লাসে প্রথম। বোর্ড পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস ছাড়া তার রেজাল্ট শিটে অন্য কোনো দাগ নেই। বাবা-মা, শিক্ষকÑসবার গর্ব সে। পড়াশোনা শেষে রাহাত বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, নামিদামি কোম্পানিতে বিশাল বেতনের চাকরি করছে।
অন্যদিকে সুমি খুব সাধারণ মানের ছাত্রী। কোনোমতে টেনেটুনে পাস করত সে। কিন্তু তার মাথায় সবসময় ঘুরত কীভাবে চারপাশের মানুষের একটু উপকার করা যায়। পড়াশোনা শেষে সে বড় কোনো চাকরিতে না গিয়ে নিজের এলাকায় কৃষকদের নিয়ে একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করল, তাদের আধুনিক চাষাবাদ শেখাতে লাগল।
কিছুদিন আগে এলাকায় যখন বন্যা হলো, রাহাত বিদেশ থেকে কিছু টাকা সাহায্য পাঠাল ঠিকই, কিন্তু সুমি রাতদিন এক করে মানুষের পাশে দাঁড়ালÑতাদের ফসল বাঁচাতে আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করল।
এখন একটা সহজ প্রশ্ন করি, আমাদের সমাজ বা দেশের জন্য কার শিক্ষার ‘লাভ’ বা ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বেশি?
আমরা যুগ যুগ ধরে শিক্ষার বিনিয়োগের ফল মাপছি কেবল জিপিএ ফাইভ, সার্টিফিকেট আর মাস শেষে বেতনের অঙ্ক দিয়ে। একটা বাচ্চা যখন স্কুলে যায়, তখন থেকেই তার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়Ñ‘তোমাকে ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে, বড় চাকরি পেতে হবে।’ এর ফলে আমরা এমন এক প্রজš§ তৈরি করছি, যারা হয়তো দারুণ সব ‘জিপিএ তৈরির মেশিন’, কিন্তু দিন শেষে তারা বড্ড আত্মকেন্দ্রিক। তারা জানে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়, কিন্তু জানে না কীভাবে রাস্তায় পড়ে থাকা একজন আহত মানুষকে সাহায্য করতে হয়।
শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে কী দিচ্ছে, সেটাই হওয়া উচিত শিক্ষার মূল মাপকাঠি। সে কি তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে এলাকার কোনো সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে? সে কি তার চারপাশের মানুষের জীবনমান একটু হলেও উন্নত করতে পেরেছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে শত শত এ-প্লাস দিয়ে এই সমাজ আসলে কী করবে?
সময় এসেছে শিক্ষার এই ‘আরওআই’ বা লাভের হিসাবটা নতুন করে কষার। আমাদের এখন এমন শিক্ষাব্যবস্থা দরকার, যা শুধু ভালো ছাত্র নয়, বরং ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করবে। এই পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রের যারা নীতিনির্ধারক আছেন, তাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজনÑ
নীতিনির্ধারকদের জন্য কিছু প্রস্তাবনা
১. সমাজভিত্তিক প্রজেক্ট বা কাজের মূল্যায়ন: পাঠ্যক্রমে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের এলাকার কোনো সমস্যা (যেমন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, কিংবা বৃক্ষরোপণ) নিয়ে কাজ করবে। শুধু পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ লিখে নয়, বরং এই বাস্তব কাজের ভিত্তিতে তাদের নম্বর বা গ্রেড দেওয়া হবে।
২. মূল্যায়নের ধরনে পরিবর্তন: পরীক্ষার খাতায় শুধু স্মৃতিশক্তির পরীক্ষা না নিয়ে শিক্ষার্থীদের সহমর্মিতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতাকেও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। রিপোর্ট কার্ডে শুধু ‘গণিতে কত পেল’ তা না লিখে, ‘সমাজের প্রতি সে কতটা দায়িত্বশীল’, তারও একটি ঘর থাকা উচিত।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকরিতে সামাজিক কাজের স্বীকৃতি: বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কেবল জিপিএ বা ভর্তি পরীক্ষার নম্বর না দেখে, একজন শিক্ষার্থী তার স্কুল-কলেজজীবনে সমাজের জন্য কী ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করেছে, সেটিকে বড় যোগ্যতা হিসেবে দেখা উচিত।
আমরা চাই আমাদের প্রতিটি ঘরে রাহাতদের মতো মেধাবীরা থাকুক, কিন্তু সেই মেধা যেন শুধু নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর কাজে না লাগে। আমাদের আরও অনেক বেশি সুমি দরকার, যাদের হয়তো জিপিএ ফাইভ নেই, কিন্তু সমাজকে বদলে দেওয়ার বিশাল হƒদয় আছে।
শিক্ষার আসল লাভ বা বিনিয়োগের সার্থকতা তখনই, যখন তা শুধু নিজের পেট নয়, বরং চারপাশের অসংখ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। সার্টিফিকেট নয়, সমাজ বদলের ক্ষমতাই হোক আমাদের শিক্ষার নতুন মাপকাঠি।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post