আনোয়ার হোসাইন সোহেল: দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ঋণ জালিয়াতি ও লুটপাটের কারণে গ্রাহকদের আস্থা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। একের পর এক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো খাতই গভীর সংকটে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও তা বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন হাজার হাজার আমানতকারী।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ ফেরত দিতে সরকারের কাছে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অর্থ ছাড় পেলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে আনুষ্ঠানিক অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লাগছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, সরকার বর্তমানে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। ফলে অবসায়ন প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবেÑএমন নিশ্চয়তা নেই। আবার এটি দীর্ঘদিন ঝুলেও থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময় যে বাস্তবতা ও আশ্বাসের ভিত্তিতে এনবিএফআই বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই বিষয়গুলো নতুন সরকারকে আবারও জানাতে হবে। নতুন সরকার যদি আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়, তাহলে প্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে। অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নতুনভাবে পর্যালোচনা করবে।’
বর্তমানে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ এবং তাদের খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদিও আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি ঋণ আদায়ে কিছু সময় দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায়; যা খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই হিসাব পাওয়া গেছে। তখন খাতটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ২৫১ কোটি টাকা।
এর আগে গত বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, খাতটির সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলোÑপিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফিন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স এবং প্রিমিয়ার লিজিং।
এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠান বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ে। অন্যদিকে আভিভা ফিন্যান্সকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আরও দুজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যত অকার্যকর ঘোষণা করা হবে এবং সম্পদ মূল্যায়ন করে দেনা পরিশোধের কার্যক্রম শুরু হবে।
বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং বিভিন্নপ্রথম পৃষ্ঠার পর
ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত রয়েছে ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে পিপলস লিজিংয়েÑপ্রায় ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি টাকা এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রকৃত হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। কারণ অনেক সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং পুনরুদ্ধারযোগ্য ঋণের তথ্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে। সম্পদ বিক্রি এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ব্যক্তি আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং যারা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা না নিলে গ্রাহকদের আস্থা আর ফিরবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, ‘জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। যারা অর্থ লুট করেছে তারা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখবে না। তিনি বলেন, এনবিএফআই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক আইন আছে। কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই। আর আমাদের দেশে যত আইন করা হয় সেগুলো আগের আইন থেকে অপরাধীদের বাঁচাতেই করা হয়। অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নয়। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬-এর ক্ষেত্রেও একই কাজ হয়েছে। সরকার আমানতকারীদের কথা না ভেবে অপরাধীদের বেইল আউট করার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের সব টাকা ফেরত দিতে বাধ্য। শুধু আমানত বীমার ২ লাখ টাকা নয়। সম্পূর্ণ টাকাই ফেরত দিতে হবে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের নৈতিক নয়, বরং আইনি দায়িত্ব। কারণ প্রতিটি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকই লাইসেন্স দিয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অবসায়নের ফলে চাকরি হারানো কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও শ্রম আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী পাওনা সুবিধা দেওয়া হবে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনÑকবে শুরু হবে অবসায়ন প্রক্রিয়া এবং কবে টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারীরা। সরকারের ধীরগতির কারণে সেই উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন গুনছেন হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম. হেলাল আহম্মেদ খান শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষ শুরুতে আশা করেছিল যে আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরবে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছিল এবং ২০২৫ সালে আমানতও কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত যেমন ব্যাংক রেজল্যুশন পাস, অতীতে ব্যাংক লুটপাটে জড়িতদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ, দলীয় বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি ঋণ নেওয়ার খবরÑমানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এছাড়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের মতো নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কেলেঙ্কারিতে অনেক গ্রাহক এখনো টাকা ফেরত পাননি। ফলে এই খাতেও আস্থাহীনতা রয়ে গেছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টির শেয়ার দরই এখন ১০ টাকার নিচে। এর মধ্যে কয়েকটির শেয়ার দর মাত্র দুটিরও কম। এই তালিকায় রয়েছেÑবে লিজিং, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, আইএলএফএসএল, মিডাস ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post