কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী: নগরজীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা ‘হকার’। সারা দেশে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ২০ লাখের কম নয়, আর তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অন্তত এক কোটি। শুধু ঢাকা শহরেই হকারের সংখ্যা প্রায় চার লাখ; এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার হকার সমিতির সদস্য, আর বাকি ২ লাখ ৭০ হাজার ভ্রাম্যমাণভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই হকারদের হঠাৎ উচ্ছেদ মানে শুধু কিছু দোকান সরানো নয়, বরং লাখো পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে কর্মহীন করে দেওয়া। এর ফলে যেমন গভীর আর্থিক সংকট তৈরি হবে, তেমনি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে; কারণ এসব পণ্যের প্রধান বিক্রেতাই হলো হকাররা। এমন পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই হকারদের উচ্ছেদ নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
বিশ্বের বিভিন্ন শহর, যেমন ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনÑতারা হকারদের দমন না করে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থান ও সময়সূচির মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় এনেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
হকারদের সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন চালু করা যেতে পারে, যেখানে তারা এককালীন নিবন্ধন ফি প্রদান করবে এবং প্রতি মাসে একটি নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ সরকারকে দেবে। এর বিনিময়ে সরকার তাদের জন্য নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত জায়গা বরাদ্দ করবে, যেখানে তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারবে, কিন্তু যেখানে-সেখানে বসার সুযোগ থাকবে না। প্রত্যেক হকারকে একটি ইউনিক আইডি কার্ড দেওয়া যেতে পারে, যাতে তার পরিচয়, নির্ধারিত স্থান ও সময় উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি তাদের দোকান বা ভ্যানগুলোকে নির্দিষ্ট নকশা এবং ভিন্ন ভিন্ন রঙে সাজানো যেতে পারে, যেমন খাবার, পোশাক, ফলমূল বা অন্যান্য পণ্যের জন্য আলাদা কালার কোড, যা শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা দুটোই বাড়াবে।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করে দিলে যানজট কমবে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল সহজ হবে। স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑসরকারকে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, পুলিশসহ কোনো প্রভাবশালী মহল বা হকার সমিতি তাদের হয়রানি করতে পারবে না। বর্তমানে অনেক হকার মাসে বিপুল অঙ্কের চাঁদা দিতে বাধ্য হন। এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে হকাররা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন, আর সাধারণ মানুষ আরও কম দামে ভালো মানের পণ্য পাবে। কারণ বাস্তবতা হলোÑসব বাধাবিপত্তির মধ্যেও হকাররাই আজ দেশের অধিকাংশ মানুষকে সাশ্রয়ী দামে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছে।
এছাড়া হকারদের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এই খাত আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হবে। এতে তারা পুঁজি বাড়াতে পারবে, ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত। তবে অতীতে দেখা গেছে, অনেক ভালো উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই পরিকল্পনাগুলো কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলেÑএ উদ্যোগ শুধু হকারদের জীবনমান উন্নত করবে না, বরং দেশের অর্থনীতি, নগর ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও সহজ ও সমৃদ্ধ করবে। সময়ের দাবি একটাইÑউচ্ছেদ নয়, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার। সঠিক উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে হকার খাতকে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
ব্যাংকার
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post