শেয়ার বিজ ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। রয়টার্স এবং প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইনফরমেশন’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় পেন্টাগনকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করবে গুগল। বিষয়টি ‘ক্লাসিফায়েড’ বা অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় চুক্তির বিস্তারিত খুব একটা প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই খবর সামনে আসার পর বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই চুক্তির পর জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলোÑমার্কিন সরকার কি তাদের সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করবে?
আমরা প্রতিদিন গুগলে যা কিছু সার্চ করি, গুগল ম্যাপস ব্যবহার করে যেখানে যাই কিংবা ইউটিউবে যেসব ভিডিও দেখিÑতার সবকিছুর রেকর্ড গুগলের সার্ভারে জমা থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেন্টাগনের এই ধরনের এআই প্রজেক্টগুলোর মূল শক্তিই হলো ‘বিগ ডেটা’। মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থাকে আরও নিখুঁত করতে, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে বা বৈশ্বিক হুমকি বিশ্লেষণ করতে গুগলের এই বিশাল ডেটা ভান্ডারের সাহায্য নিতে পারে।
যদিও গুগল বরাবরই দাবি করে যে তারা ব্যবহারকারীদের ডেটা বিক্রি করে না বা সুরক্ষিত রাখে, কিন্তু সামরিক চুক্তির বাস্তবতা ভিন্ন। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ দমনের’ অজুহাতে মার্কিন সরকার সহজেই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তথ্য চেয়ে নিতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কী খুঁজছেন বা কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেনÑএসব তথ্য হয়তো সরাসরি আপনাকে টার্গেট করে ব্যবহƒত হবে না, কিন্তু সামরিক বাহিনীর এআই সিস্টেমকে ‘ট্রেইন’ করার জন্য ঠিকই কাজে লাগানো হতে পারে। সোজা কথায়, সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের ডেটা মার্কিন মিলিটারির কোনো অ্যালগরিদমের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহƒত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
স্মার্টফোন কীভাবে যুদ্ধের ময়দানে প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে দেখা গেছে, পকেটে থাকা সাধারণ একটি স্মার্টফোনের কারণেই অনেক শীর্ষ জেনারেল বা সেনা কর্মকর্তা প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। যখনই কেউ ফোন চালু করেন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, সেটি একটি ডিজিটাল সিগন্যাল তৈরি করে। এই সিগন্যাল বা জিপিএস ডেটা বিশ্লেষণ করে শক্তিশালী এআই সিস্টেমগুলো নিমিষেই ওই ব্যক্তির নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করে ফেলে। এমনকি অনেক সময় শীর্ষ জেনারেলরা নিরাপত্তার খাতিরে নিজে স্মার্টফোন ব্যবহার না করলেও, তাদের নিরাপত্তারক্ষী বা গাড়িচালকদের ফোন হ্যাক করে ও ট্র্যাক করে তাদের ড্রোন বা মিসাইল হামলার নিশানা বানানো হয়েছে। এ ঘটনাগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সাধারণ একটি ডিজিটাল যন্ত্রের তথ্য বা ডেটা যদি আধুনিক সামরিক বাহিনীর হাতে পৌঁছায়, তবে তা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে ২০১৮ সালেও গুগল পেন্টাগনের সঙ্গে ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ নামের একটি সামরিক ড্রোন এআই প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছিল। সেবার গুগলের নিজস্ব কর্মীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এবারের চুক্তিটি অত্যন্ত সাবধানে ও গোপনে করা হয়েছে। এ থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, প্রযুক্তি আর সামরিক শক্তির এই মেলবন্ধন সহজে থামার নয়, আর এই প্রক্রিয়ায় আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা দিন দিন আরও বেশি হুমকির মুখে পড়ছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post