নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের জ্বালানি খাতে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে; যা বাংলাদেশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাস্তবিক অগ্রগতির দিকে নিয়ে গেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার পদ্মা নদীর তীরবর্তী এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ইউনিটে সম্পূর্ণ জ্বালানি লোডিং শেষ করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। জ্বালানি লোডিংয়ের পর শুরু হবে চেইন রিঅ্যাকশন, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রক্রিয়া। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। পরবর্তীতে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে, যার ফলে জ্বালানি লোডিংয়ের পথ উš§ুক্ত হয়।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরবর্তী এই প্রকল্পটি রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর শুরু হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ হলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে প্রথম জ্বালানি চালান ঢাকায় পৌঁছায় এবং পরে তা কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রূপপুরে সংরক্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৬১ সালে। তবে জমি অধিগ্রহণের পর তৎকালীন
পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। স্বাধীনতার পর পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন হয়।
এই চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবল প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুটি ইউনিটের কাঠামো নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় এক বছর চলতে পারে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহƒত জ্বালানি ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট প্যালেট তৈরি করে সেগুলো ধাতব নলের মধ্যে সাজিয়ে জ্বালানি রড বানানো হয়। একাধিক রড একত্রে যুক্ত হয়ে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি তৈরি করে। রূপপুরে প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে ৩১২টি রড রয়েছে এবং প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post