ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ/আনোয়ার হোসাইন সোহেল: স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো মানুষের গুরুতর অসুস্থতায় একজন দক্ষ চিকিৎসক ও নির্ভরযোগ্য হাসপাতালের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু সেই হাসপাতালই যদি রোগীর আস্থার জায়গা না হয়ে প্রতারণার কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে সেটি শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায় । তেমনি একটি হাসপাতাল রাজধানীর আশকোনায় অবস্থিত ‘আর- রাহা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস লিমিটেড’, যা নিয়ে রয়েছে বিস্তর ও গুরুতর অভিযোগ । চিকিৎসাসেবার নামে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকসে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট, অদক্ষ লোক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা এবং রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার নানা অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। জানা গেছে, পূর্বাচলের একাংশ, দক্ষিণখান, আশকোনা এবং খিলক্ষেতের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানকার মানুষ সরল বিশ্বাস নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন । ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম বন্ধে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অনুমোদনহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে শুরু হয় অভিযান। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের এমন কঠোর অবস্থানের মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান নানা কৌশলে এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে আর-রাহা হাসপাতালের নাম । ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি আশকোনার হজ ক্যাম্প সংলগ্ন
Ar-Raha Hospital & Diagnostics Ltd. ArRaha আর-রাজ্য হসপিটাল এন্ড ডায়াগনষ্টিকস্ লিঃ
চিকিৎসাসেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ■ ভুয়া ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট প্রদান
অদক্ষ জনবল দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম
এলাকায় অবস্থিত হাসপাতালটি। অবস্থানগত কারণে উত্তরা, কাওলা, খিলক্ষেত ও দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এটি সহজগম্য। এ সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে হাসপাতালটি অনলাইন ও অফলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে রোগী আকৃষ্ট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে রোগীরা গিয়ে পাচ্ছেন ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালটিতে রোগীদের নানা উপায়ে আর্থিকভাবে শোষণ করা হয়। হাসপাতালের নির্ধারিত প্যাকেজের বাইরে অতিরিক্ত বিল করা
যেন নিয়মিত ঘটনা।
দক্ষিণখানের মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা মারুফ হাসান (৩০) অভিযোগ করে বলেন, টনসিলের সমস্যার কারণে তিনি হাসপাতালটিতে ভর্তি হন। হাসপাতালের চার্টে টনসিল অপারেশনের খরচ ২০ হাজার ৯৫০ টাকা উল্লেখ থাকলেও ভর্তি হওয়ার পর বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয় । তিনি বলেন, ‘প্যাকেজের মধ্যে ওষুধ থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অপারেশনের পর আবার নতুন করে ওষুধ কিনতে বলা হয়। এছাড়া অপারেশনের আগে-পরে অপ্রয়োজনীয় কয়েকটি টেস্ট করানো হয়। পরে অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করিয়ে দেখি রিপোর্টের সঙ্গে কোনো মিল নেই।’
এমন অভিযোগ শুধু মারুফের একার নয় । আরও কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেন, হাসপাতালটির প্যাথলজি বিভাগে দেওয়া রিপোর্টের কোনো নির্ভরযোগ্যতা নেই। অনেক সময় রোগীদের ভুল রিপোর্ট প্রদানপূর্বক আতঙ্কগ্রস্ত করে অতিরিক্ত টেস্ট বা পরীক্ষার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। একজন রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার মায়ের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে গুরুতর সমস্যা দেখানো হয়েছিল। পরে অন্য হাসপাতালে একই পরীক্ষা করালে রিপোর্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আসে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘এখানে রোগীকে জিম্মি করে টাকা নেওয়ার নজির রয়েছে।’ আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, হাসপাতালে তালিকাভুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেককেই প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, এমবিবিএস বা বিশেষায়িত ডিগ্রি না থাকা কিছু মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টকে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখানো হয় । এমনকি কিছু জটিল অপারেশনেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রমাণিত হলে তা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। কারণ অদক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা রোগীর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে ।
হাসপাতালটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ । রোগীদের স্বজনরা জানান, ওয়ার্ডগুলো অপরিষ্কার, বাথরুম ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং রোগীদের খাবারের মানও খুব খারাপ। এছাড়া হাসপাতালের আশপাশে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যেতে চাপ সৃষ্টি করে ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অভিযানের সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্ৰী ডা. এম এ মুহিত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় জনবল, মানসম্মত সেবা ও বৈধ অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। ভুয়া চিকিৎসক ও প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নজরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারিও প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীদের সচেতন হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কোনো হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে চিকিৎসকের যোগ্যতা, হাসপাতালের অনুমোদন এবং সেবার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
আর-রাহা হাসপাতালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধি কথা বলতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মঈনুল আহসান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হাসপাতাল- ক্লিনিকের অনিয়মের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুরু হওয়া অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ গণমাধ্যমের সহায়তা কামনা
করে তিনি বলেন, “আপনারা গণমাধ্যমের কর্মীরা যদি কোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পান, তাহলে দ্রুত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করুন। এ ব্যাপারে সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’ স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি মানুষের জীবন নিয়ে খেলা । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্তপূর্বক অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন—এমন প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের। অন্যথায় এমন প্রতিষ্ঠানগুলো আরও অনেক নিরীহ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে নিঃস করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
এসব বিষয়ে কথা বলতে আর-রাহা হাসপাতালের সিইও শামসুল আরেফিন আব্দুল্লাহের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে এড়িয়ে যান । পরে তার মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করে ও হোয়াটসঅ্যাপ | নম্বরে এসএমএস পাঠালে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যার আপনাদের মঙ্গলবার কল করতে বলেছেন।’ পরবর্তী সময়ে মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি । এরপর একাধিকবার এসএমএস পাঠালেও আর- রাহা কর্তৃপক্ষ তার কোনো প্রত্যুত্তর দেয়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শেয়ার বিজকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য দিতে পারব না। তবে ঢাকা সিটি করপোরেশনে হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকসে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের সমাজ এখন পচনশীল । যদি কেউ চিকিৎসার নামে জনস্বাস্থ্যবিরোধী ও সমাজবিরোধী কাজ করে তাহলে তাদের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এই অপরাধীরা যেন সুযোগ না পায়। এই সমাজ এখন কলঙ্কিত। এ জন্য কার্যকর একটি মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post