আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী: উত্তরবঙ্গের শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চল একসময় মরুভূমির মতো শুষ্ক ছিল। বছরে মাত্র একটি ফসল ফলত, খরায় ফেটে যেত মাটি; আর পানির অভাবে হাহাকার পড়ত কৃষকের ঘরে। আজ সেই একই অঞ্চল সবুজ শস্যভান্ডারে পরিণত হয়েছে। ধান, গম, ভুট্টা, সরষে, আম প্রতি বছর তিনটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে লাখ লাখ হেক্টর জমিতে। এই অসাধারণ রূপান্তরের নায়ক বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সংস্থাটির কার্যক্রমে বর্তমানে ১৫ লাখেরও বেশি পরিবার সরাসরি উপকৃত হচ্ছে। মানুষ, মাটি ও পানির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই উন্নয়ন উত্তরাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় বড় অবদান রাখছে। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের কৃষকরা বলেন, উত্তরবঙ্গকে খাদ্যভান্ডারে পরিণত করার পেছনে প্রয়াত চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামানের অবদান অসামান্য । তার পরিকল্পনা না থাকলে এ অঞ্চলের কৃষি এতটা
এগোতো না।
১৯৮৫ সালে সরকার ‘বরেন্দ্র সমন্বিত অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে। ১৯৯০ সালে প্রকল্প সমাপ্ত হয় মাত্র ২৬ শতাংশ বাজেট ব্যয় করে। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকেই শুরু হয় সত্যিকারের বিপ্লব।
বিএমডিএ চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে একাই ১ হাজার ৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্প (ডিপ টিউবওয়েল) স্থাপন করেছে। এর ফলে আগে যেখানে বছরে একবার ফসল হতো, সেখানে এখন প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার উপকৃত। মহানন্দা, পুনর্ভবা নদীসহ বিভিন্ন খালে ৮৮টি লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) স্থাপন করে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে, যা ১২ হাজার পরিবারকে সহায়তা করছে।
সার্বিকভাবে বিএমডিএ রাজশাহী ও রংপুর
বরেন্দ্র
উন্নয়ন
বিভাগের ১৬টি জেলায় সেচ সুবিধা প্রদান করছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, প্রায় ১৫ হাজার ৫৬০টি ডিপ টিউবওয়েল এবং ৯৯১টি লো লিফট পাম্পের মাধ্যমে ৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৬৭ হেক্টর জমিতে সেচ সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যান্য সূত্রে ভূ-গর্ভস্থ সেচের আওতায় ৫ দশমিক ২ লাখ হেক্টর এবং ভূ- উপরিস্থ পানির আওতায় আরও প্রায় ৯৭ হাজার হেক্টর জমি উল্লেখ করা হয়েছে। মোট উপকারভোগী কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৯ লাখ থেকে ১৫ লাখের মধ্যে। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা । বিএমডিএ এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬৬১ কিলোমিটার খাল খনন, ১০টি বিল উন্নয়ন এবং ৪ হাজার ৩৬৪টি পুকুর খনন করেছে। বারিড পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৫১২ কিলোমিটারেরও বেশি, যা পানির অপচয় কমিয়ে সেচ দক্ষতা বাড়িয়েছে। পুনঃখননকৃত খাল ও পুকুরের পাড়ে এবং পতিত জমিতে প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এটি শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করছে না, জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ করছে।
বিএমডিএ’র অন্যতম বড় সাফল্য ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি। খরা মৌসুমে নির্ভরতা কমাতে পুকুর ও খাল পুনঃখনন, ক্রস ড্যাম নির্মাণ এবং নদী থেকে পানি উত্তোলনের প্রকল্প চলছে । ৩ হাজার ৩৫৭টি পুকুর, ২ হাজার ৬৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন এবং ৭৪৭টি ক্রস ড্যামের মাধ্যমে
ভূ-উপরিস্থ সেচের আওতা বেড়েছে। পদ্মা, মহানন্দা ও আত্রাই নদীতে ফ্লোটিং পন্টুন ও রাবার ড্যাম স্থাপন করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিএমডিএ সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করছে। বর্তমানে শতাধিক সোলার এলএলপি চালু রয়েছে। প্রিপেইড মিটার চালুর ফলে পানির অপচয় কমেছে এবং কমান্ড এরিয়া ২২ শতাংশ বেড়েছে। ড্রিপ ইরিগেশনের মতো আধুনিক পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষির পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও বিএমডিএ সক্রিয়। ২৩৪টি সুপেয় পানি সরবরাহ স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের খাবার পানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সেচ নালা এবং ১৮৬ কিলোমিটার সংযোগ পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যা কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করেছে। উঁচু জমিতে আম বাগান সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে গভীর নলকূপের সেচের কারণে।
বিএমডিএ’র চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশীদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ‘ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার প্রকল্প’ সম্ভাব্য ব্যয় ৮৩৯ কোটি টাকা। *জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানি সরবরাহ প্রকল্প’র সম্ভাব্য ব্যয় ৫৮৭ কোটি টাকা। এগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে। নতুন পরিকল্পনায় ১২০টি এলএলপি স্থাপন করে ছয় হাজার হেক্টর জমি পদ্মা নদীর পানির আওতায় আনা হবে। বর্তমানে ছয় কিমি খাল, দুটি বিল (১১৫ ও ১২৭ একর) এবং ১৪৫টি পুকুর পুনঃখনন চলছে।
বিএমডিএ’র বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মরুময়তা রোধ করছে। প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটি গাছ রোপণের পাশাপাশি খাস খাল ও পুকুর পুনঃখনন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে, স্থানীয় জলজ প্রাণী ও পাখির সংখ্যা বাড়ছে। কম পানিনির্ভর ফসল (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈলবীজ) উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বোরো ধানের পরিবর্তে। বিএমডিএ’র সেচ ব্যবস্থা বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উত্তরবঙ্গ থেকে আসা ফসল দেশের চাহিদার বড় অংশ মেট- ায়। কৃষকদের আয় বেড়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক-ঘাট উন্নয়নের ফলে পণ্য পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছে । অনেক কৃষক এখন আম, লিচু, ম্যাঙ্গোসহ উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। এদিকে বিএমডি প্রথম
কার্ডভিত্তিক প্রিপেইড মিটার করে পানির অপচয় কমিয়েছে। ড্রিপ ইরিগেশন ও সোলার সেচ পাম্প জনপ্রিয় করছে।
বিএমডিএ’র রাজশাহী রিজিওন নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহ- মান বলেন, ‘নতুন পরিকল্পনার আওতায় ১২০টি লো-লিফট পাম্প স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমি পদ্মা নদীর পানির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং কৃষি- তে টেকসই সেচব্যবস্থা গড়ে উঠবে।’ এছাড়া মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহ- ারে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, ডাবল লিফটিং প্রকল্প (৮৩৯ কোটি টাকা) এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা প্রকল্প (৫৮৭ কোটি টাকা)। এগুলো বাস্তবায়িত হলে আরও ১৮ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post