হাসান শিরাজী: রাফসানের ঘরের আলো কয়েক মাস ধরে রাত ৩টার আগে নেভেনি। চোখের নিচে কালি, বিকালের আড্ডা বন্ধ এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়াও বাদ। সামনে তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাবা-মায়ের স্বপ্ন আর নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য ছেলেটার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। পরীক্ষার দিন সকালে মায়ের দোয়া নিয়ে যখন সে কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বের হবে, ঠিক তখনই তার এক বন্ধুর মেসেজÑ‘দোস্ত, প্রশ্ন তো আউট হয়ে গেছে! ইন্টারনেটে যা ঘুরছে, হুবহু মিলে যাচ্ছে!’
প্রথমে রাফসান বিশ্বাস করেনি। কিন্তু পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে যখন দেখল, যারা সারা বছর বইয়ের পাতা উল্টে দেখেনি, তারা হাসিমুখে বের হচ্ছে আর বলছে, ‘পরীক্ষা দারুণ হয়েছে,’ তখন রাফসানের মনে হলো তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তার এত রাতের ঘুম নষ্ট করা, এত পরিশ্রমÑসব যেন এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে গেল।
এর কয়েক দিন পর হয়তো কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানালÑ‘প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হলো। আগামী মাসে আবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।’
আমাদের দেশে প্রশ্নফাঁস হলে এটাই সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্য। কর্তৃপক্ষ ভাবে, আবার পরীক্ষা নিলেই তো সব সমাধান হয়ে গেল! কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন ওই মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীর মনের অবস্থার কথা? আবার পরীক্ষা নেওয়াটা রাফসানদের মতো সৎ এবং পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো সমাধান নয়, বরং এটি তাদের প্রতি এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। যে ছেলেটা তার সেরা প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল, তাকে আবারও সেই একই ক্লান্তিকর ও ভয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হবে সম্পূর্ণ অন্য মানুষের করা অপরাধের কারণে। এতে করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি যে বিতৃষ্ণা জš§ নেয়, তা আর কোনোদিন ঠিক হয় না।
বারবার পরীক্ষা নেওয়াটা হলো মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো অবস্থা। আমাদের খুঁজে বের করতে হবে আসল সমস্যাটা কোথায়। প্রশ্নফাঁসের এই ক্যানসারের মূল শিকড় কোথায় লুকিয়ে আছে, সেটা আগে উপড়ে ফেলতে হবে।
যারা দেশ চালাচ্ছেন, শিক্ষাব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করছেন, তাদের কাছে সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু বিনীত অথচ স্পষ্ট দাবি আছেÑ
১. শিকড় খুঁজে বের করা: শুধু দু-একজন ফটোকপি দোকানের মালিক বা সাধারণ দালাল ধরলে হবে না। যেখান থেকে প্রশ্ন তৈরি হয়, যেখানে ছাপা হয়, আর যেখান থেকে কেন্দ্রে পৌঁছায়Ñএই পুরো প্রক্রিয়ার কোথায় কোথায় গলদ আছে, সেটা বের করতে হবে। রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় না আনলে এই চক্র কখনোই ভাঙবে না।
২. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: আমরা ডিজিটাল যুগের কথা বলি, অথচ পরীক্ষার প্রশ্নের নিরাপত্তার বেলায় এখনো সেই মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি। কাগজের প্রশ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রশ্নপত্রের ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। অথবা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে কেন্দ্রে প্রশ্ন ছাপানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে পথে প্রশ্ন গায়েব হওয়ার সুযোগ না থাকে।
৩. দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা: যে বোর্ডের বা যে জেলা প্রশাসনের অধীনে প্রশ্ন ফাঁস হবে, সেখানকার সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ‘আমি তো জানতাম না’ বা ‘আমার অগোচরে হয়েছে’ বলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। দায়িত্ব নিলে দায়ভারও নিতে হবে।
৪. কঠোর ও দ্রুত শাস্তি: প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ যখন দেখবে অপরাধীর জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এই এক জঘন্য অপরাধের কারণে, তখন অন্যরা এ পথে পা বাড়াতে ভয় পাবে।
প্রশ্নফাঁস শুধু একটা পরীক্ষাই নষ্ট করে না; এটা একটা জাতির মেরুদণ্ড আস্তে আস্তে ভেঙে দেয়। যে শিক্ষার্থী দেখে দুর্নীতি করে তার চেয়ে ভালো ফল করা যায়, সে বড় হয়ে আর সৎ থাকতে চায় না। রাফসানদের নীরব কান্না যেন আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেককে নাড়া দেয়। আমরা এমন কোনো সমাজ চাই না, যেখানে মেধার চেয়ে চুরি করা প্রশ্নের দাম বেশি। আসুন, শুধু পরীক্ষা বাতিল নয়, প্রশ্নফাঁসের কারণটাই চিরতরে বাতিল করি।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post