নিজস্ব প্রতিবেদক: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নিজের জমা রাখা টাকা তুলতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অনেক আমানতকারী। অবসরের সঞ্চয়, প্রবাসজীবনের আয় কিংবা ব্যবসার মূলধনÑসবই আটকে আছে ব্যাংকে। অথচ নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে না পেরে কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, কেউ সংসার চালাতে হাত পাতছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের এই দুর্ভোগ এখন দুই বছর পার হয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকÑএই পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে একত্র করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হলেও স্বস্তি ফেরেনি আমানতকারীদের জীবনে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকে টাকা থাকলেও তা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। সীমিত উত্তোলন, অনিয়মিত লেনদেন এবং মুনাফা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। কেউ চিকিৎসা খরচ চালাতে পারছেন না, কেউ সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তাদেরই একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা জাকারিয়া। তার মতো অনেকেই জীবনের সব সঞ্চয় ব্যাংকে রেখেছিলেন স্থায়ী আমানত হিসেবে। এখন সেই অর্থ আটকে থাকায় তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন। একইভাবে প্রবাসফেরত আফজালুলের মতো বহু গ্রাহক সুদের বিকল্প হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তারাও চরম অনিশ্চয়তায়।
একইরকম দুঃখের কথা শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আছমা আক্তার। তিনি বলেন, অবসরের সময় চেয়েছিলাম পরিবার নিয়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে আল্লাহর বন্দিগি করে বাকি জীবন পার করব। কিন্তু তিল তিল করে সঞ্চয় করা আমানতের টাকা ফেরত পেতে এখন রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াতে হয়। দিনের পর দিন ব্যাংকে ধরনা ধরতে হয়।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ‘হেয়ার কাট’ পদ্ধতি নিয়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমানতের বিপরীতে গ্রাহকরা মাত্র ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। অথচ অনেকেই ১২ থেকে ১৪ শতাংশ মুনাফার প্রত্যাশায় আমানত রেখেছিলেন।
এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা বলছেন, এটি শুধু অন্যায্যই নয়, বরং বৈষম্যমূলকও। কারণ যারা আগেই টাকা তুলে নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোনো কাটছাঁট হয়নি; কিন্তু যারা এখনও আমানত ধরে রেখেছেন, তারাই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী এই সিদ্ধান্তকে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, পরিচালকদের লুটপাট ও ব্যাংকের ক্ষতির দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো ঠিক নয়; এটি আর্থিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের’ প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি। এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণই মূল সংকটের কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট চরমে পৌঁছেছে এবং স্বাভাবিক লেনদেন কার্যতসংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে। এর একটি অংশ বিনিয়োগে ব্যবহার করা হলেও বাকি অর্থ দিয়ে গ্রাহকদের আংশিক অর্থ ফেরত এবং পরিচালন ব্যয় মেটানো হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি মাসে শুধু বেতন-ভাতা ও পরিচালন খাতেই প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যা ব্যাংকের আয় দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শুরুতেই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোঁজা অবস্থায় চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে ভাইভা সম্পন্ন হয়েছে। যদিও নানা জটিলতার কারণে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়োগপ্রাপ্ত এমডি সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সঙ্গে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিটও করা হয়েছে একাধিক উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও হঠাৎ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থার প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, সরকার অনুমোদিত একটি ব্যাংকে টাকা রাখার পরও যদি গ্রাহকরা তা তুলতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো আর্থিক খাতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ছোট আমানতকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান শেয়ার বিজকে বলেন, সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য নতুন কোনো স্কিম ঘোষণা করা হয়নি। সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট এ নিয়ে কাজ করছে। এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়াও তাদেরই হাতে। ইতোমধ্যে এমডি পদে নিয়োগের জন্য ভাইভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত, তবে সম্মিলিত ব্যাংকের নতুন এমডি কে হচ্ছে তা জানাতে পারেননি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিমের আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ আমানতকারীকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে এ অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post