অরণ্য আজাদ: বাংলাদেশে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও বেড়েছে। আগে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত ছিল, এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
তবে এই বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও চাকরির বাজারে তাদের বড় অংশ কাক্সিক্ষত দক্ষতা নিয়ে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে উচ্চশিক্ষা এখন শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠছে বারবার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। গবেষণার ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব, সেশনজট, দক্ষতার অভাব এবং বেকারত্বÑসব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে।
তবে শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সমান নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণাগার, লাইব্রেরি কিংবা দক্ষ শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পেলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে থাকছে।
বিশেষ করে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবর্তে শুধু সনদ প্রদানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গবেষণা। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ এখনো সীমিত।
অনেক শিক্ষক পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান পান না। গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাবও বড় সমস্যা। ফলে বিশ্বমানের গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো দুর্বল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব নয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দীর্ঘদিন ধরে সেশনজট বড় সমস্যা হিসেবে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক থেকে দুই বছর বেশি সময় লেগে যায় অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে।
এর ফলে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশ দেরি হয়। পরিবারকেও বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও বাড়ে।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সেশনজট কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বিষয়। কেউ কেউ মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখে। আবার সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে।
মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ, হল দখল এবং সহিংসতার ঘটনা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে। অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতাও অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে, তবে তা যেন শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না করে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করছে, স্নাতকদের বাস্তব দক্ষতার অভাব রয়েছে।
বিশেষ করে যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধান এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ঘাটতি চাকরির বাজারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখনো অনেকাংশে তাত্ত্বিক। শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয় পর্যাপ্ত নয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা পর্যাপ্তভাবে চালু হয়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি কিংবা রোবোটিক্সের মতো বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স চালু করেছে। অনলাইন শিক্ষা এবং ভার্চুয়াল ল্যাব ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন। উন্নত গবেষণা সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে তারা বিদেশমুখী হচ্ছেন।
কিন্তু এর ফলে মেধাপাচারের আশঙ্কাও বাড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে স্থায়ী হয়ে যান। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ জনবল সংকট তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মানসম্মত গবেষণা ও কর্মপরিবেশ তৈরি করা গেলে মেধাপাচার কমানো সম্ভব।
উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সমান।
তবে এখনো নিরাপত্তা, আবাসন সংকট এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা নারী শিক্ষার্থীরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছেÑগবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ্যক্রম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ উন্নয়ন।
তারা আরও বলেন, শুধু ডিগ্রি নয়, বরং উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করাই হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা এখন সম্ভাবনা ও সংকটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
যদি গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। অন্যথায় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা আরও বাড়বে।
দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করছে এমন এক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর, যা শুধু সনদ নয়, বরং দক্ষ, উদ্ভাবনী ও মানবিক নাগরিক তৈরি করতে পারে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post