রামিসা রহমান: বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার আগের তুলনায় অনেক বেশি এবং নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পেছনে এখনো লুকিয়ে আছে বড় ধরনের বৈষম্য। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের পার্থক্য, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং দারিদ্র্যের প্রভাব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করে। ফলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান নির্ভর করে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শহরের তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছে। যদিও সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তবুও কাক্সিক্ষত ফল পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার এখন প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া।
গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণির আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোতে ছেলেশিশুদের অল্প বয়সে কাজ করতে পাঠানো হয়। অন্যদিকে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে একটি বড় কারণ। অনেক পরিবার মনে করে মেয়েদের বেশি পড়াশোনার প্রয়োজন নেই।
চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা আরও কঠিন। বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে অনেক শিশু দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দক্ষ শিক্ষকের অভাব। দেশের অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এখনো প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। আবার যেসব শিক্ষক রয়েছেন, তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন দক্ষ শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশ বদলে দিতে পারেন। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শহরে বদলির সুযোগ কম এবং সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষক গ্রামে থাকতে অনাগ্রহী।
অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায় না। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ইংরেজি শিক্ষকের অভাব গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বহু গ্রামীণ বিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। অনেক স্কুলের ভবন জরাজীর্ণ। বর্ষাকালে পানি ঢুকে ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোথাও পর্যাপ্ত বেঞ্চ বা বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই।
স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব বিশেষ করে কিশোরীদের জন্য বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী নিরাপদ পানির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
গ্রামের অনেক বিদ্যালয়ে এখনো লাইব্রেরি নেই। খেলার মাঠের অভাবও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষা এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনো ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে অনলাইন ক্লাস, স্মার্ট ডিভাইস এবং ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন পর্যন্ত নিয়মিত ব্যবহার করতে পারে না।
করোনাকালে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনলাইন ক্লাস চালু হলেও গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেনি। অনেক এলাকায় ইন্টারনেটের গতি দুর্বল ছিল। আবার অনেক পরিবারের পক্ষে স্মার্টফোন কেনাও সম্ভব হয়নি।
তবে সরকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ডিজিটাল শিক্ষা গ্রামীণ শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক পরিবার এখনো শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, লেখাপড়া শেষ করেও চাকরি পাওয়া কঠিন। ফলে তারা সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই আয়মুখী কাজে উৎসাহিত করেন।
বিশেষ করে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোয় মৌসুমি কাজের সময় শিশুদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের আয়ের অংশ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোয় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের অনেকেই এখনো নতুন পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারেননি। ফলে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর বাস্তবায়নে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
অনেক অভিভাবকও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি বুঝতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করা সময়ের দাবি।
সরকার শিক্ষার উন্নয়নে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বিনা মূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং, নতুন শিক্ষাক্রম এবং ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নারীশিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ফলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা।
শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো নয়, বরং শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষতা অর্জন করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শ্রেণিতে উঠলেও মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিত দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, গ্রামীণ শিক্ষার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ।
তারা আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, বরং সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। শহর ও গ্রামের শিক্ষার বৈষম্য কমানো ছাড়া সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ শিক্ষক, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে গ্রামীণ শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে আজকের গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার ওপর।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post