হাসান শিরাজি : বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনে সন্তানের পড়াশোনা এখন এক বড় আর্থিক চাপের নাম। মাসের আয় থেকে একটি বড় অংশ চলে যায় স্কুল-কলেজের বেতন, কোচিং, সহায়ক বই, যাতায়াত, পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য খরচে। ফলে জাতীয় বাজেটের দিকে তাকিয়ে এসব পরিবার শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে না, বরং খোঁজে বাস্তব পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তাই শিক্ষা খাতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। অথচ একটি দক্ষ, আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক জাতি গড়তে হলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার শিক্ষা বাজেটে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না; প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। অতীতের মতো থোক বরাদ্দ দিয়ে দায় শেষ করলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে না। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন স্তরে কত বিনিয়োগ হবে এবং তার ফল কী হবে, সেটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
বাংলাদেশে শিক্ষা উন্নয়নের বড় অংশ এখনও অবকাঠামোকেন্দ্রিক। নতুন ভবন নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ভবন দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। শ্রেণিকক্ষে দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব এবং কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও আন্তর্জাতিক তুলনায় অনেক কম। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং দুর্বল পাঠদান ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার মান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। তাই মাথাপিছু শিক্ষাব্যয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা আসন্ন বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী দক্ষতায় গড়ে তুলতে না পারলে বেকারত্ব কমানো কঠিন হবে। শুধু সাধারণ ডিগ্রি নয়, শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা তৈরি করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বড় সংস্কার জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্প খাতের সঙ্গে সংযুক্ত জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণা অনুদান, ইন্টার্নশিপ, ক্যারিয়ার সেন্টার এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ বাড়ানো না গেলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আরও বাড়বে।
একুশ শতকের বাস্তবতায় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাক্ষরতা এখন আর বিলাসিতা নয়। স্কুল পর্যায় থেকেই ডিজিটাল দক্ষতা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য বাজেটে পর্যাপ্ত ও বাস্তবায়নযোগ্য বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষার ব্যয়ের বড় অংশ এখনও পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়। এটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানো না গেলে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ইউনিফর্ম সহায়তা, উপবৃত্তি বৃদ্ধি, মিড-ডে মিল এবং সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিও জরুরি। দরিদ্র, প্রান্তিক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়ক ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা শিক্ষায় অংশগ্রহণ ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটে শিক্ষা ও আইসিটি খাতের বরাদ্দ আলাদা করে দেখানোও জরুরি। দুই খাত একসঙ্গে দেখালে প্রকৃত শিক্ষা ব্যয়ের চিত্র অস্পষ্ট থাকে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আলাদা বাজেট কাঠামো প্রয়োজন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সুশাসন। শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষা খাতের সংকট দূর হবে না। বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার ফল কী হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছেÑএসব বিষয়ে কঠোর জবাবদিহিতা থাকতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেট তাই গতানুগতিক বাজেট হলে চলবে না। এটি হতে হবে একটি রূপান্তরমুখী বাজেট। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে নয়, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে পারে।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post