আদানি ও এস আলমের চুক্তি সংশোধন হোক

‘আদানি ও এস আলমের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র: চুক্তির ভুলে মাসে ১,২০০ কোটি টাকা গচ্চার আশঙ্কা পিডিবির’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, তা বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনাকেই সামনে এনেছে।

সংকট ঠেকাতে সরকার যখন কৃচ্ছ্রসাধন, অফিস সময় কমানোসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন বেশি দামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা কেনা প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতিটন কয়লা ২৩৭ ডলারে এবং আদানি ও এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৪৩৪ ডলারে কেনা হচ্ছে। ফলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় পড়বে ২১ টাকা, যা ডিজেলের সমান।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা এলাকায় আদানি গ্রুপের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ বছর বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। এ জন্য চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। একইভাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এস আলমের কয়লাভিত্তিক এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ২৫ বছর বিদ্যুৎ কিনবে সরকার। এ চুক্তি সই হয়েছিল ২০১৬ সালে। আগামী ডিসেম্বরে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রই উৎপাদনে আসার কথা। অথচ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এত দিন পর চুক্তিতে ভুল শনাক্ত করেছে। পিডিবি বলছে, ভুল চুক্তির ফলে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে!

বিদ্যুতের টানা লোডশেডিংয়ে দেশব্যাপী জনদুর্ভোগ বেড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ তথ্য, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হলেও, এখন তা বেড়ে হয়েছে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চার ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। ঢাকার বাইরে কোনো কোনো এলাকায় ৭ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি) তথ্যমতে, দেশে এখন মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৩টি। এর মধ্যে গ্যাসচালিত ৫৭ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১১ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার মেগাওয়াট। অর্ধেকের বেশি উৎপাদন ক্ষমতা অলস পড়ে থাকছে গ্যাসের অভাবে। ফার্নেস তেলচালিত ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৫ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট এবং ১১টি ডিজেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৫১৫ মেগাওয়াট। সব মিলে জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও দিনে গড়ে উৎপাদন হচ্ছে আড়াই থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। এতেও সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে প্রতি বছর। গত তিন বছরেই সরকার কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য থাকলেও এ খাতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় তা অনেকটাই ম্লান করে দেয়। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) চালু রাখতে সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থ লোকসান দিচ্ছে। তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মেটাতে তেলে চালিত ভাড়া ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হয়েছিল কিন্তু রাষ্ট্রকে দিতে হচ্ছে বড় মূল্য। এখন ভুল চুক্তির ফলে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে? যেহেতু ভুল চিহ্নিত করা গেছে, তাই উচিত হবে সময়ক্ষেপণ না করে চুক্তি সংশোধন করে বাজার দামে যৌক্তিক দামে জ্বালানি কেনা।