প্রতিবন্ধিতাকে জয় করা সংগ্রামী নারী ফেন্সি

পারভীন লুনা, বগুড়া: প্রতিবন্ধী নারীরা যে সমাজের বোঝা নয়, তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দ–্যতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বাসিন্দা মর্জিনা খাতুুন ফেন্সি (৪২)। দুই পায়ের শক্তি হারিয়েও ভিক্ষাবৃত্তি মতো ঘৃণ্য কর্মে না জড়িয়ে জালি টুপি বুনে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। প্রতিবন্ধীতাকে জয় করা সংগ্রামী নারী ফেন্সির জীবনী থেকে অন্যান্য নারী-পুরুষের শিক্ষা নেয়া উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সেরুয়া বটতলা থেকে ৪ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে নওদাপাড়া গ্রাম। এ গ্রামেই বসবাস করেন ফেন্সি। ৫ ভাই ৬ বোনের বড় পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। ফলে চতুর্থ শ্রেণির গণ্ডিই পেরোনো হয়নি তার। বয়স যখন ৮-৯ বছর। এমন সময় জ্বরে পড়েন ফেন্সি। কয়েকদিনের টানা জ্বরে দুই পা অবশ হতে থাকে। অভাবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সৈয়দা মাহমুদা খাতুন দম্পতি মেয়ের ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। এর কয়েক বছর পর মেয়েকে বিয়ে দেন তারা। বেশ ভালোই চলছিল ফেন্সির সংসার। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর ফেন্সির সংসারে নেমে আসে সীমাহীন অভাব। অভাবের কারণে ফেন্সিকে রেখে সংসার ছেড়ে পালিয়ে যার তার স্বামীও।

দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে সংসারের হাল ছাড়েনি তিনি। নামেননি ভিক্ষাবৃত্তিতে। বরং নিজের দুই হাতকে কাজে লাগিয়ে জালি টুপি বুনতে শুরু করেন তিনি। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে চলে তার সংসার ও দুই মেয়ের পড়ালেখার খরচ।

সম্প্রতি ফেন্সির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টুপি বুনাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে ফেন্সি বলেন, ছোট বেলায় অসুস্থ হয়ে দুই পা হারিয়েছি। স্বামীও চলে গেছে, সংসার দেখার মতো কেউ ছিল না। ভিক্ষাবৃত্তিতে নামার বিষয়ে মন সায় দেয়নি। তখন থেকেই টুপি বুনতে শুরু করি। সেই টাকা জমিয়ে কিছু জায়গা কিনে দুটি ঘরও করেছি। ছোট মেয়েকে একটা কেজি স্কুলে ভর্তি করেছি। সে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। এ আয় থেকেই বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, নিজ উপার্জনে বাড়ি করেছি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। তবে বয়স বাড়ায় এখন আর চোখ আগের মতো কাজ করে না। একটানা টুপি সেলাই করলে চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। চশমা পরলেও তেমন কাজ হয় না। দুটো পা নিয়ে ক্র্যাচে ভর দিয়েও এখন ভালোভাবে চলতে পারি না।

ফেন্সি বলেন, টুপি সেলাই থেকে মাসে দেড় হাজার টাকার মতো আয় হয়। আর প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। তা দিয়েই চলে সংসার। কিন্তু এখনকার বাজারে এই সামান্য টাকায় চলা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই সরকারের কাছে আবেদন আমাকে যদি একটা কর্মের ব্যবস্থা করে দিতো, তাহলে বাকি সময়টা হয়তো ভালোভাবে কাটাতে পারতাম।

স্থানীয়রা জানান, দুই পা হারানো প্রতিবন্ধী মেয়েটি একটি সংগ্রামী নারী চরিত্র। মেয়েটি যেভাবে সংসার চালাচ্ছে এটি সমাজের জন্য একটা উদাহরণ। সমাজে অনেক সুস্থ নারীকেও ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখা যায়। পা হারানো ফেন্সি এর ব্যতিক্রম। সেসব মানুষকে ফেন্সির জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

এ বিষয়ে ১০নং শাহবন্দেগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, মর্জিনা খাতুন ফেন্সি আমার ইউনিয়ন পরিষদের একজন ভোটার। প্রতিবন্ধী হয়েও মেয়েটি যেভাবে স¡াবলম্বী হয়েছে, তা সমাজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। তথ্য নিয়েছি ফেন্সি প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। তাছাড়া আমার ইউনিয়নে যখন যে সরকারি সুযোগ-সুবিধা আসবে আমি তাকে অবশ্যই দেবো। তাকে একটি দোকান ঘর করে দেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারেও ভাববেন বলে জানান তিনি।