আয়নাল হোসেন: দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে গত দেড় থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ভোজ্যতেলের দাম মণপ্রতি বেড়েছে ১৮০ থেকে ৪২০ টাকা পর্যন্ত। ভোক্তাদের অভিযোগ, যে কোনো অজুহাতে দাম বাড়ান ব্যবসায়ীরা। তবে পরিবেশকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে বাজারে দাম বাড়ছে।
রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ আগে পরিবেশক পর্যায়ে প্রতি মণ (৩৭ কেজি ৩২০ গ্রাম) সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল তিন হাজার টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৮০ টাকা ৩৯ পয়সা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে তিন হাজার ১৮০ টাকায়। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম বেড়েছে ১৮০ টাকা এবং কেজিপ্রতি ৪ দশমিক ৮২ পয়সা।
এদিকে আগে প্রতি মণ সুপারপাম তেলের দাম ছিল দুই হাজার ৫০০ টাকা। এ হিসাবে কেজিপ্রতি দাম পড়ে ৬৬ টাকা ৯৯ পয়সা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৭৬ দশমিক ৩৭ পয়সা। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম বেড়েছে ৩৫০ টাকা এবং কেজিপ্রতি ৯ টাকা ৩৮ পয়সা। আর আগে প্রতি মণ পাম তেলের দাম ছিল দুই হাজার ৩০০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৬১ দশমিক ৬৩ পয়সা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৭২০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে ৭২ টাকা ৮৮ পয়সা। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম বেড়েছে ৪২০ টাকা এবং কেজিতে ১১ দশমিক ২৫ পয়সা।
পরিবেশক পর্যায়ে ড্রামজাত ভোজ্যতেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বোতলজাত তেলের দাম ইতোমধ্যে বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। যদিও বর্ধিত মূল্যের বোতলজাত সয়াবিন তেল এখনও বাজারে সরবরাহ দেওয়া হয়নি বলে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন।
মৌলভীবাজারের কুচরা ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে লিটারপ্রতি ৫ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন তীর ব্র্যান্ডের প্রতি লিটার বোতল সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১০৫ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের মালিকানাধীন রূপচাঁদা ব্যান্ডের প্রতি লিটার বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) ১০৫ টাকা এবং ৫ লিটারের বোতলের মূল্য ৫৩০ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিক দাম বাড়ানো উচিত নয় বলে মনে করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর ভুঁইয়া বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেন, যা মোটেও উচিত নয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল দেশে পৌঁছতে দেড় থেকে দুই মাস সময় প্রয়োজন হয়। ডিজিটাল যোগাযোগের কারণে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে বিষয়টি খতিয়ে দেশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আন্তর্জাতিক নিউজ পোর্টাল ইনডেক্স মুন্ডি ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৮৭৫ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৮০০ ডলার, মার্চে ৭৪৭ ডলার, এপ্রিলে ৬৭৯ ডলার, মে মাসে ৬৮৩ ডলার, জুনে ৭৫১ ডলার এবং জুলাই মাসে ৮২১ ডলার। একইভাবে জানুয়ারিতে পাম তেলের দাম ছিল ৮১০ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ৭২৮ ডলার, মার্চে ৬৩৬ ডলার, এপ্রিলে ৬০৮ ডলার, মে মাসে ৬৮৩ ডলার, জুনে ৬৫১ ডলার এবং জুলাই মাসে ৬৯৪ ডলার।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব দেশে পড়েছে। এ কারণে বাজারে সয়াবিন তেল, সুপার পাম ও পাম তেলের দাম বেড়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ব বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাস আগে রাজধানীর বাজারগুলোতে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৮৪ থেকে ৮৫ টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে শতকরা চার দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি লিটার সুপার পাম তেলের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৭৩ থেকে ৭৬ টাকায়। এ সময়ের ব্যবধানে লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে দুই দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর এক মাস আগে প্রতি লিটার পাম তেলের দাম ছিল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭৩ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে পাঁচ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই ব্যবহার হয় চার লাখ টন। দেশে করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সারা দেশে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়। তখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বায়ার চীনে ভোজ্যতেল সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে দেশে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করায় বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যায়।




